সাজেকে অবরোধ শিথিল ঘোষণার পরও সড়কে যান চলাচল বন্ধ

রাঙামাটির পর্যটনকেন্দ্র সাজেককে ঘিরে চলমান সড়ক অবরোধ কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অবরোধ আহ্বানকারী দুটি সংগঠন একদিনের জন্য কর্মসূচি শিথিলের ঘোষণা দিলেও এর বিরোধিতা করে পাল্টা অবরোধের ডাক দিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা।
এতে রোববার (১ নভেম্বর) সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেও বন্ধ রয়েছে খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-সাজেক-বাঘাইছড়ি সড়কে যানবাহন চলাচল। ফলে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রী, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, রোগী ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
আজ সকাল সাড়ে ৮টায় খাগড়াছড়ি জেলা শহরের ন্যান্সী বাজার এলাকায় অবস্থিত দীঘিনালা-খাগড়াছড়ি বাসস্টেশনে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় স্টেশনে আটকা পড়েছেন বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরা। চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও ঢাকা থেকে আসা যাত্রীদের অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো যানবাহন পাচ্ছেন না। জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষ বিকল্প যানবাহন খুঁজেও ব্যর্থ হচ্ছেন। অন্যদিকে পাল্টা অবরোধের ঘোষণা দেওয়া সংগঠনের কাউকে মাঠপর্যায়ে দেখা না গেলেও খাগড়াছড়ির পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের সড়কে যান চলাচল বন্ধ রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে।
মিতালী চাকমা নামে একজন জানান, অবরোধ শিথিলের খবর পেয়ে মারিশ্যা (বাঘাইছড়ি) থেকে অসুস্থ মাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যেতে খাগড়াছড়িতে এসেছেন। কিন্তু পাল্টা অবরোধের কারণে যানবাহন না পেয়ে নিজেই পড়েছেন চরম বিপাকে।
অন্যদিকে দীঘিনালা সরকারি ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. মুনির কলেজের পরীক্ষা-সংক্রান্ত জরুরি কাজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেও গাড়ি না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
পরিবহন শ্রমিক জসীম উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পর্যটনের ভরা মৌসুমে দুটি সংগঠনের কর্মসূচির কারণে পুরো পরিবহন খাত জিম্মি হয়ে পড়েছে। নিজেদের ইচ্ছামতো সড়ক অবরোধ করবে, আবার নিজেদের সিদ্ধান্তে তা শিথিল করবে এভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা চলতে পারে না। একদিনের জন্য অবরোধ শিথিলের সিদ্ধান্ত তারা মানেন না। এ কারণে তারাও পাল্টা সর্বাত্মক সাজেক অবরোধের পথে নেমেছেন।
আরেক পরিবহন শ্রমিক জহিরঞ্জন ত্রিপুরা বলেন, আমরা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষ। অনেক দিন পর আজ যাত্রী নিয়ে দীঘিনালা ও সাজেক রুটে যাওয়ার আশা করেছিলাম। ভেবেছিলাম কিছু আয়-রোজগার হবে। কিন্তু আবারও সব বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের মতো শ্রমজীবী মানুষের পরিবার কীভাবে চলবে, সেটাই এখন বড় চিন্তা।
খাগড়াছড়ির পরিবহন নেতা মীর হোসেন ও আয়ুস কান্তি চাকমা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অচলাবস্থায় পরিবহন খাতসহ পর্যটননির্ভর সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখা জরুরি। আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান না এলে চলমান পর্যটন মৌসুমে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন। একই সঙ্গে পরিবহন শ্রমিক, চালক, হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ী, পর্যটন গাইডসহ হাজার হাজার মানুষের জীবিকা ভয়াবহ সংকটে পড়বে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাজেককে ঘিরে চলমান এই অচলাবস্থা শুধু একটি সড়কের যান চলাচল বন্ধ রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে পুরো খাগড়াছড়ি ও সাজেকের পর্যটন অর্থনীতিতে। পর্যটন মৌসুমে এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পর্যটক আগমন কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দিনমজুরদের আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে এক পক্ষের অবরোধ শিথিলের ঘোষণা এবং অন্য পক্ষের পাল্টা অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট সংগঠন, পরিবহন নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
গত ২২ অক্টোবর থেকে সাজেক ইস্যুতে থেমে থেমে চলা এই সড়ক অবরোধের শনিবার ছিল দশম দিন। নানা বৈরী পরিস্থিতি ও স্থানীয় জনগণের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি এবং সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন রোববার একদিনের জন্য অবরোধ কর্মসূচি শিথিলের ঘোষণা দেয়। সংগঠন দুটির নেতা বাবুধন চাকমা ও নতুনজয় চাকমার পাঠানো বার্তায় সাজেক এলাকার সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মাসব্যাপী কঠিন চীবর দান উৎসবের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানানো হয়।
তবে অবরোধ মাত্র একদিনের জন্য শিথিলের ঘোষণায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি পরিবহনসংশ্লিষ্ট একটি পক্ষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা সড়ক অবরোধের প্রচারণা শুরু হয়। শনিবার রাতে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি’র সদস্য সচিব হিসেবে পরিচয় দেওয়া বিন্দু লাল চাকমার পক্ষ থেকে একই সড়কে পাল্টা অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর জের ধরে রোববার সকাল থেকেই খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
