৩৯৬ জনের কবর খুঁড়েছেন, নিজের জায়গাও প্রস্তুত রেখেছিলেন হাফেজ শিকদার

মানুষের শেষ বিদায়ের প্রস্তুতিতে নীরবে কাজ করে গেছেন হাফেজ শিকদার। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই নিজ হাতে খনন করেছেন ৩৯৬টি কবর। ইচ্ছা ছিল আরও চারটি কবর খনন করে সংখ্যাটি ৪০০-তে উন্নীত করার। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন তিনি। এছাড়াও নিজের কবরের জায়গাও প্রস্তুত রেখেছিলেন তিনি।
তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায়। প্রিয় এই মানুষটিকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে জানাজায় সমবেত হন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার হাজারো মানুষ।
হাফেজ শিকদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তবে এলাকার মানুষের কাছে তার পরিচিতি ছিল নিঃস্বার্থ সেবক হিসেবে। কোথাও কারও মৃত্যুর খবর পেলেই কবর খনন ও দাফনের প্রস্তুতিতে সহযোগিতা করতে ছুটে যেতেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে বিনা পারিশ্রমিকে মানুষের এই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়ে অর্জন করেছিলেন সবার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।
স্থানীয় মানুষ ও ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার মানুষের অংশগ্রহণে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সৎ ও পরোপকারী এই মানুষটির মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
হাফেজ শিকদারের মেজো ছেলে মো. হারিস শিকদার বলেন, আমাদের এলাকায় কেউ মারা যাওয়ার খবর পেলেই আব্বা কবর খননের জন্য ছুটে যেতেন । তার ইচ্ছা ছিল আরও চারটি কবর খুঁড়ে ৪০০টি পূর্ণ করবেন। কিন্তু সেই ইচ্ছা আর পূরণ হলো না আব্বার। সবাই আমার আব্বার জন্য দোয়া করবেন।
মরহুমের ছোট ছেলে এসএম আলমাস বলেন, বাবা গতকালও আমাদের মাঝে ছিলেন, কিন্তু আজ আর নেই। তিনি আগে থেকেই বাড়ির সামনে নিজের জন্য কবরের জায়গা প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। এমনকি নিজের কাফনের কাপড়ও দোকানে কিনে রেখে গিয়েছিলেন। বাবা আমাদের ছয় ভাই-বোনকে খুব ভালোবাসতেন। এলাকার সবাই তাকে খুব পছন্দ করতেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. কামাল বলেন, কাকা অত্যন্ত ভালো মনের মানুষ ছিলেন। আমাদের দেখলেই ডাক দিত, হাসিমুখে কথা বলতো। কারও মৃত্যুর খবর শুনলেই দাফনের জন্য সহযোগিতা করতে ছুটে যেতেন। আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাত দান করুন।
হাফেজ সিকদারের ছোট ছেলে এসএম আলমাস বলেন, গতকালও বাবা আমাদের সঙ্গে ছিলেন, অথচ আজ তিনি নেই। আব্বা মৃত্যুর আগেই আমাদের বাড়ির সামনে নিজের কবরের জায়গা নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। আব্বা নিজের কাফনের কাপড়ও দোকান থেকে কিনে রেখেছিলেন। বাবা আমাদের ছয় ভাই-বোনকে অনেক ভালোবাসতেন।
কুয়াকাটা পৌর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম মিরন বলেন, হাফেজ শিকদার চাচা ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও পরোপকারী একজন মানুষ। তিনি ৩৯৬ জনেরও বেশি মানুষের জন্য কবর খনন করেছেন। তিনি ধর্মভীরু মানুষ ছিলেন। এমন একজন মানুষকে হারিয়ে আমরা কুয়াকাটাবাসী গভীরভাবে শোকাহত।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বেশ কিছুদিন ধরে কিডনির অসুস্থতাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন হাফেজ শিকদার। গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতে বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়লে স্বজনেরা তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন রোববার (২৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তার মৃত্যু হয়।
কুয়াকাটা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে বসবাস করতেন হাফেজ শিকদার। এলাকাবাসীর কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন মানুষের দুঃসময়ের একজন নির্ভরযোগ্য সহায়তাকারী হিসেবে। বিনা পারিশ্রমিকে কবর খননের মাধ্যমে মানুষের শেষ বিদায়ের প্রস্তুতিতে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখেছেন তিনি। তার মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন স্থানীয় বিভিন্ন পেশার মানুষ। একই সঙ্গে তারা শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন।
