জামালপুরে তীব্র গ্যাস সংকট, ভোগান্তি চরমে

কোনো প্রকার পূর্বঘোষণা বা মাইকিং ছাড়াই টানা দুদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জামালপুরের অধিকাংশ এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া শহরের একমাত্র সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়েয়ও মিলছে না গ্যাস। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন সিএনজি, হাইয়েস ও বাসের চালকেরা।
জামালপুরে প্রতিদিন চলে প্রায় পাঁচ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বিপুলসংখ্যক গ্যাসচালিত যানবাহন। তবে পুরো জেলায় গ্যাস নেওয়ার একমাত্র ভরসা ‘জাবেদ ফিলিং স্টেশন’। এই একটামাত্র পাম্পে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন বিপর্যয়। এই গ্যাসসংকটে সবচেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা ও স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্সচালকেরা। রোগী বহনকারী কিংবা জরুরি ট্রিপে থাকা অ্যাম্বুলেন্সগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় আটকে থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
পাম্পের সামনে অপেক্ষারত অ্যাম্বুলেন্সচালক বাঁধন মিয়া বলেন, ময়মনসিংহ থেকে জামালপুরে রোগী নিয়ে আসছি। এখন গাড়িতে যে গ্যাস আছে, তা দিয়ে ফেরত যাওয়া সম্ভব না। গ্যাস পাওয়ার আশায় বৃহস্পতিবার রাতে এখানে আসছি, এখন পর্যন্ত পাম্পের সামনে বসে ও শুয়ে আছি। গ্যাস পেলে তো অত দূর যেতে পারব। গ্যাসই যদি না থাকে, আমরা যাব কীভাবে? এখন আমাদের কী করার আছে! মালিক ফোন দিচ্ছে কখন যাব। মালিককে জানালাম, গ্যাস ছাড়া তো আর যেতে পারব না।
সিএনজিচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে পাম্পটিতে মাত্র এক ঘণ্টার জন্য সামান্য গ্যাস দেওয়া হয়েছিল। কিছুক্ষণ দেওয়ার পরেই গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় আবার সব বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পুরো রাত ও সকাল গড়িয়ে বিকেল হলেও আর গ্যাস মেলেনি।
শুক্রবার ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজিচালক আব্দুল মালেক বলেন, ভোর চারটার সময় বাসা থেকে গাড়ি নিয়ে বের হইছি, এখনো পাম্পের লাইনে বসে আছি। গাড়ি রাস্তায় রেখে তো আর বাড়িতে যাওয়া যাবে না। এখন দুপুর হয়ে গেল, এক টাকাও আয় করতে পারলাম না, উল্টো ১৫০ টাকা খরচ হয়ে গেছে। আমাদের মতো দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের তো আর কিছু করার নাই।

আরেক সিএনজিচালক জসিম উদ্দিন বলেন, শুক্রবার সকালে আসছি, এখন তো বিকেল হলো। আজকেও দেবে কি না কিছু বলে না। সারাদিন এভাবে বসে থাকলে পরিবার চালাব কীভাবে আর কিস্তির টাকাই বা দেব কেমনে! আমরা দিন আনি দিন খাই। এখন যদি গ্যাসের জন্য সারাদিন পাম্পে বসে থাকি, তাহলে ইনকাম করব কখন?
পাম্পের দীর্ঘ লাইনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা সময় নষ্ট হওয়া এবং পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ার অজুহাতে সড়কে বের হওয়া সিএনজিচালকেরা সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গ্যাস না থাকায় রাস্তায় ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে যানবাহনও কিছুটা কম দেখা গেছে। সাধারণত যে রুটে ভাড়া ৩০ টাকা, সেখানে ৪০ থেকে ৫০ টাকা দাবি করা হচ্ছে।
শহরের বাইপাস মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা রাজু নামে এক যাত্রী বলেন, গ্যাসের দোহাই দিয়ে চালকেরা কিছুটা ভাড়া বাড়তি নিচ্ছে। আজকে তো গাড়িও অনেক কম দেখা যাচ্ছে। বাধ্য হয়েই আমাদের পকেটের বাড়তি টাকা খসাতে হচ্ছে।
এদিকে পাম্পের জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি শহরের বাসাবাড়ির গ্যাসের এই আকস্মিক সংকট চরম দুর্ভোগে ফেলেছে সাধারণ পরিবারগুলোকে। শহরের চামড়াগুদাম এলাকার বাসিন্দা স্বর্ণা বলেন, গতকাল সকালে উঠে দেখি গ্যাস নেই, সন্ধ্যার পর এসেছিল। আজকে সকালে উঠেও দেখি গ্যাস নেই। কখন আসবে জানি না। কত দিন গ্যাস থাকবে না, সে বিষয়ে আমাদের কোনো ধারণাই নেই। তিতাসের উচিত ছিল আগে থেকে মাইকিং করে জনসাধারণকে বিস্তারিত জানানো, তাহলে আমরা সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে পারতাম।
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে জাবেদ ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার আতিক রহমান বাবর বলেন, গ্যাসের এই সংকটটা শুধু আমাদের এখানে না, সারা বাংলাদেশে। গ্রিড থেকে গ্যাস আমরা যেভাবে পাই, সাথে সাথেই তা গ্রাহকদের দেওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের পাম্পের মেশিনে কোনো ত্রুটি নেই। লাইন থেকে প্রেসার পেলেই আমরা সবাইকে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ করে দিচ্ছি।
অন্যদিকে জামালপুর তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ম্যানেজার দুর্জয় খকসী জানান, মূল সরবরাহ লাইনে কোনো গ্যাস না থাকায় এই সংকট দেখা দিয়েছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। উল্লেখ্য, জামালপুর জেলায় তিতাস গ্যাসের মাসিক চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনমিটার।



