‘জয় বাংলা’ স্লোগানের পর আইভীর আইনজীবীসহ তিনজন গ্রেপ্তার

নারায়ণগঞ্জের আদালত প্রাঙ্গণে সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার ঘটনার পর তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিয়াউল ইসলাম কাজলসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ফতুল্লা মডেল থানায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে প্রত্যেকের পাঁচ দিন করে রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেছে পুলিশ।
জানা গেছে, মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে নারায়ণগঞ্জ আদালতে হাজিরা দিতে এসে তুহিন হত্যা মামলায় পুনরায় জামিন পান সাবেক মেয়র আইভী। আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়ে গাড়িতে ওঠার সময় তাকে ‘জয় বাংলাকে দাবিয়ে রাখা যাবে না, জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে শোনা যায়। এ সময় তার সঙ্গে থাকা কয়েকজনকেও স্লোগান দিতে দেখা যায়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাতেই আইনজীবী কাজলসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার তিনজন হলেন অ্যাডভোকেট জিয়াউল ইসলাম কাজল (৬৩), আতিকুল ইসলাম (৫৫) ও মাহবুবুর রহমানকে (৩৬)।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (১৪ অক্টোবর) ফতুল্লা মডেল থানার উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. সোহানুল ইসলাম গ্রেপ্তার তিনজনের প্রত্যেকের পাঁচ দিন করে রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ৯, ১০, ১১ ও ১২ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর ভোরে ফতুল্লার ইসদাইর ওসমানী পৌর স্টেডিয়ামের সামনের সড়কে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নেতাকর্মী ও সহযোগীরা গোপন বৈঠক করেন বলে তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মিছিল-স্লোগানের মাধ্যমে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে (১৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টা ৫৫ মিনিটে ফতুল্লার আল্লামা ইকবাল রোড ও দেওভোগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে জিয়াউল ইসলাম কাজল, আতিকুল ইসলাম ও মাহবুবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ও এর সহযোগী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ও সমর্থক বলে জানা গেছে । তবে এসব অভিযোগ এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন, সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, সম্ভাব্য অস্ত্রের মজুত শনাক্ত, অন্য আসামিদের পরিচয় ও অবস্থান নির্ণয় এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের স্বার্থে তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করেছে পুলিশ।

এদিকে গ্রেপ্তার কাজলকে নিয়ে আপত্তি তুলেছেন আইভীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, দিনের বেলায় স্লোগান দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাতে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করেছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। তবে জিয়াউল ইসলাম কাজল কোনো স্লোগান দেননি। তিনি তার মক্কেলকে আদালত থেকে বের করে গাড়িতে তোলা এবং এ সময় যাতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করছিলেন।
আওলাদ হোসেনের দাবি, ঘটনার সময় স্লোগান দেওয়া ব্যক্তিরা সেখানে উপস্থিত থাকলেও কাজলকে স্লোগান দিতে দেখা যায়নি। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাকে আইভীর পাশে মামলার নথিপত্রের ফাইল হাতে হাঁটতে দেখা যায়। তার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয় বলেও মনে করেন এই আইনজীবী।
তিনি বলেন, আইনজীবীদের দায়িত্ব আদালতে মক্কেলের পক্ষে আইনি লড়াই করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। মিটিং-মিছিল কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানের সঙ্গে তাদের পেশাগত দায়িত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা আদালতের ভেতরে শুনানি করেছেন এবং বাইরে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সেই সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও রেকর্ডও রয়েছে, যেখানে কোনো স্লোগান দেওয়া হয়নি।
পুলিশের কাছে ভিডিও ফুটেজ থাকলে তা পর্যালোচনা করে প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদাভাবে যাচাই করার দাবি জানিয়ে আওলাদ হোসেন বলেন, কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ ছাড়া তাকে মামলায় জড়ানো বা গ্রেপ্তার করা অনাকাঙ্ক্ষিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া, কাউকে অযথা হয়রানি করা নয়।
এ বিষয়ে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বিও কাজলকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, কাজলকে এ ধরনের মামলায় যুক্ত করা সঠিক হয়নি বলে তিনি মনে করেন। ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনে কাজল সক্রিয়ভাবে রাজপথে ছিলেন। কাজল একজন আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এমন একজন আইনজীবীকে এ ধরনের মামলায় যুক্ত করায় বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
আদালত প্রাঙ্গণে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়াকে সমর্থন করেন না জানিয়ে তিনি বলেন, এই স্লোগানকে কেন্দ্র করে নিরপরাধ মানুষ ও আইনজীবীদের হয়রানি বা গ্রেপ্তার করাও সমর্থনযোগ্য নয়। দেশে কোনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করে বের করা গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব। ষড়যন্ত্রের অজুহাতে কাউকে হয়রানি করা উচিত নয়।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী এশিয়া পোস্টকে বলেন, আদালত প্রাঙ্গণে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের স্লোগান দেওয়ার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত ২৪ সেপ্টেম্বর দায়ের করা ফতুল্লা থানার ৫৭ নম্বর মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা ও মামলার ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলাটিতে আরও আসামি রয়েছেন। তাদের মধ্যে এই তিনজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। গভীর রাতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে সকালে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ আদালত পুলিশের পরিদর্শক আব্দুস সামাদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ফতুল্লা থানার মামলায় গ্রেপ্তার কাজলসহ তিনজনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তারা আদালতের হাজতখানায় রয়েছেন। আদালতের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হবে।
