১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপির ওপর যে আস্থা রেখেছিলেন, তা ধরে রাখুন: প্রধানমন্ত্রী

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির ওপর জনগণ যে আস্থা রেখেছেন, তা ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বিএনপি জনগণের সঙ্গে ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও দেশের মানুষের স্বার্থে কাজ করবে।
শনিবার (১৬ আগস্ট) কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়ি ঘাট এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে মাছের পোনা অবমুক্ত ও বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
জনগণের উপকার হলে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে
তারেক রহমান বলেন, আমাদের লক্ষ্য, আমাদের উদ্দেশ্য বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন। বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে গ্রাম ও উপজেলায় থাকা মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়, এমন পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ আমরা ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করতে চাই।
তিনি বলেন, খাল খনন কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ অভিযান, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালু, শিক্ষার্থীদের পোশাক ও নতুন বই দেওয়া, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের আর্থিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। বিএনপির রাজনীতির মূল লক্ষ্য এমন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা, যাতে দেশের মানুষ, বিশেষ করে গ্রামের মানুষ উপকৃত হন। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশকে কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।
সমাবেশে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন করেন, মাছের পোনা অবমুক্তকরণ, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, শিক্ষার্থীদের উন্নয়ন ও ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সহযোগিতার মতো কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে কি না। উপস্থিত জনতা সমস্বরে ‘হ্যাঁ’ বলে জবাব দেন। খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে গ্রামের মানুষের পানির চাহিদা ও সেচসুবিধা বাড়বে কি না, এমন প্রশ্নেও উপস্থিত জনতা ইতিবাচক সাড়া দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব কর্মসূচিতে কেউ বাধা দিলে, রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে কিংবা মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করলে জনগণকে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
‘এখন সময় দেশকে এগিয়ে নেওয়ার’
তারেক রহমান বলেন, ‘এখন সময় হচ্ছে কাজ করার। এখন সময় হচ্ছে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। রাষ্ট্র মেরামতের কাজ শুরু করতে হবে। দেশ পুনর্গঠনের কাজ আমাদের করতে হবে।’
তিনি বলেন, এক দিনে দেশের সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আগের সরকারের সময়ে অর্থনীতি, পররাষ্ট্র, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব খাতকে পুনর্গঠন করতে হচ্ছে।
দেশের মালিক জনগণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে জনগণকেই সামনে আসতে হবে। গণতান্ত্রিক অধিকার সমুন্নত রাখতে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে ১০ বছরের পরিকল্পনা
দেশের বিদ্যুৎ সংকটের জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ‘অপরিকল্পিত’ বিভিন্ন পদক্ষেপকে দায়ী করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আগামী ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হবে। সেখানে আগামী ১০ বছরে কীভাবে দেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা হবে, সেই পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।
তারেক রহমান বলেন, সংকট মোকাবিলায় ধৈর্য ধরে পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে। বিদ্যুৎ সংকটকে কেন্দ্র করে রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ও জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।
‘দেশের মানুষ শান্তি ও আইনের শাসন চায়’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ এখন শান্তি, শৃঙ্খলা, আইনের শাসন, কর্মসংস্থান, সন্তানদের শিক্ষা এবং পরিবারের জন্য ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থা চায়। এসব নিশ্চিত করতে সরকারকে সময় দিতে হবে এবং সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে। আপনারা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির ওপর যে আস্থা রেখেছিলেন, সেই আস্থা ধরে রাখুন। বিএনপি আপনাদের সঙ্গে ছিল, বাংলাদেশের জনগণের পাশে আছে এবং জনগণের জন্যই কাজ করবে।
এর আগে বিএনপিকে নির্বাচিত করার জন্য জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, জনগণের দেওয়া দায়িত্ব বিএনপি অতীতে পালন করেছে এবং ভবিষ্যতেও দেশের মানুষের স্বার্থে কাজ করবে।
কিশোরগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ড ও সম্মানী কার্যক্রম উদ্বোধন
পাকুন্দিয়ায় মাছের পোনা অবমুক্ত করার পর প্রধানমন্ত্রী কটিয়াদীর আচমিতা এলাকায় কার্প হ্যাচারি কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন। পরে আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউশন মাঠে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর উদ্বোধন ও জাতীয় মৎস্য পদক প্রদান করেন।
এ সময় দেশের অব্যবহৃত পুকুর, হাওর-বাঁওড় ও অন্যান্য জলাশয় সংস্কার করে তরুণদের মধ্যে বণ্টনের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। এসব জলাশয়ে মাছের পোনা অবমুক্ত করে স্থানীয় তরুণদের মাধ্যমে মাছ চাষের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
বিকেলে কিশোরগঞ্জ পুরাতন স্টেডিয়ামে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, মেধাবী শিক্ষার্থী, অসুস্থ, দুস্থ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনুদান এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের ব্যক্তিদের সম্মানী প্রদান অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী।
ল্যাপটপের বাটন চাপার মাধ্যমে তিনি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার লতিবাবাদ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ৪৫৭ জন নারীর মুঠোফোনে ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বিভিন্ন মসজিদের ৪৩২ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম, পাঁচটি মন্দিরের ১০ জন পুরোহিত এবং একটি গির্জার দুজন যাজকসহ মোট ৪৪৪ জনকে সম্মানী দেওয়ার কার্যক্রম উদ্বোধন করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে চাকরির নিয়োগপত্র পান শারীরিক প্রতিবন্ধী আনিসুর রহমান। এ ছাড়া মেধাবী শিক্ষার্থী জ্যোতি রাণী দাস, ইমাম আমান উল্লাহ, পুরোহিত দীপেন্দ্র চক্রবর্তী ও সেভেন্থ-ডে অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের যাজক উইথ ক্লেব রং তাঁদের অনুভূতি প্রকাশ করেন।
কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান এ সময় হাওর এলাকায় উড়ালসেতু নির্মাণের দাবি জানান।
সন্ধ্যায় শোলাকিয়ায় প্রধানমন্ত্রী
পুরাতন স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে প্রধানমন্ত্রী ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে যান। সেখানে তিনি শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করেন এবং জেলা ছাত্রদলের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
পাকুন্দিয়ার অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দীন। অনুষ্ঠানে কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ও বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানসহ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
পুরাতন স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।



