logo
Advertisement

প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৪০৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়

এশিয়া পোস্ট নিউজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৪০৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। ছবি : এশিয়া পোস্ট

সকালে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, এরপর বিদ্যালয়ের হিসাব-নিকাশ, দাপ্তরিক চিঠিপত্র, অনলাইন কার্যক্রম, বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব ও উপজেলা পর্যায়ের সভা—সবই সামলাতে হচ্ছে একই শিক্ষককে। অথচ তার মূল পদ সহকারী শিক্ষক। প্রধান শিক্ষক না থাকায় এমন অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শত শত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে।

Advertisement

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় অনুমোদিত ১ হাজার ১০৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমানে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক রয়েছেন ৬৯৬ জন। ফলে ৪০৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে নবীনগর উপজেলা। সেখানে ২১৯টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ১২৯ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ৯০টি পদ।

এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় ১২৯টি পদের মধ্যে ৭৫ জন কর্মরত থাকায় ৫৪টি পদ শূন্য রয়েছে। সরাইল উপজেলায় ১২৬টি পদের মধ্যে কর্মরত ৭৫ জন, শূন্য ৫১টি। কসবা উপজেলায় ১৬৩টি পদের বিপরীতে ১১৪ জন কর্মরত থাকায় ৪৯টি পদ শূন্য রয়েছে।

বিজয়নগর উপজেলায় ১০০টি প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ৫২ জন। সেখানে ৪৮টি পদ শূন্য। বাঞ্ছারামপুরে ১৩৯টি পদের মধ্যে ১০০ জন কর্মরত থাকায় শূন্য রয়েছে ৩৯টি পদ। নাসিরনগরে ১২৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৯০ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ৩৬টি পদ।

অন্যদিকে, আশুগঞ্জ উপজেলায় ৪৯টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ২৭ জন। ফলে ২২টি পদ শূন্য। আখাউড়া উপজেলায় ৫৪টি পদের মধ্যে ৩৪ জন কর্মরত থাকায় শূন্য রয়েছে ২০টি পদ।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ওপর। একজন সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের শ্রেণিকক্ষের দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে। ফলে কোথাও কোথাও পাঠদানে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। আবার শিক্ষকসংকটে থাকা বিদ্যালয়গুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

প্রধান শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থাতেও রয়েছে বড় ধরনের জনবল ঘাটতি। জেলার নয়টি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অনুমোদিত ৫৫টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২০ জন। অর্থাৎ ৩৫টি পদ শূন্য রয়েছে।

ফলে বিদ্যালয় পরিচালনা, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা কার্যক্রম এবং উপজেলা পর্যায়ের তদারকি—প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ তিনটি স্তরেই জনবল সংকটের প্রভাব পড়ছে।

এই সংকটের বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় আশুগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম তালশহর পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষিকা জোনিয়া বেগম বলেন, তাঁদের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর তুলনায় এমনিতেই শিক্ষকসংখ্যা কম। বর্তমানে পাঁচজন শিক্ষকের মধ্যে দুজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন। বাকি তিনজনের মধ্যে একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে ৩২৪ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে সবকিছু সামলাতে হচ্ছে। শিক্ষক কম থাকায় একাধিক সংযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যালয়ে শিক্ষক পাঠানোর বিষয়টি অবগত করলেও সেটি আমলে নেওয়া হয়নি।

তার ভাষ্য, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে প্রশাসনিক কাজ, উপজেলা পর্যায়ের সভাসহ নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, একজন সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিতে হলে তাঁর পাঠদানের সময় কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর।

কসবা উপজেলার শ্যামবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক জহিরুল ইসলাম স্বপন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রায় এক দশক ধরে অনেক বিদ্যালয় চলতি বা ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন জটিলতা ও দীর্ঘদিনের মামলার কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি দীর্ঘদিন আটকে ছিল।

তিনি আরও বলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা মূলত সহকারী শিক্ষক পদেই বহাল থাকেন এবং সেই পদ অনুযায়ী বেতন পান। প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁরা মাসিক মাত্র দেড় হাজার টাকা দায়িত্বভাতা পান।

জহিরুল ইসলাম স্বপনের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জটিলতা প্রাথমিক শিক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মামলার জটিলতা কাটলেও প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে সংকট নিরসন বিলম্বিত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

প্রধান শিক্ষক সংকট নিরসনের বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামসুর রহমান বলেন, শূন্য পদগুলো পূরণে পর্যায়ক্রমে নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। নিয়োগ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে প্রধান শিক্ষক সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া কবে শেষ হবে এবং ৪০৯টি বিদ্যালয়ে কবে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময় জানাতে পারেননি তিনি।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করতে হলে দ্রুত প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির জটিলতা নিরসন করতে হবে। কারণ, একটি বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব যখন দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্তের হাতে থাকে, তখন দায়িত্বের ভার বাড়ে ঠিকই; কিন্তু সেই ভার সামলাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা কার্যক্রমের।