যশোর থেকে রাজধানীর অপরাধ সাম্রাজ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন

ঢাকার ব্যস্ততম এলাকায় গুলিতে নিহত দেশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী নাইমুর হাসান টিটনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে তার অতীত, পারিবারিক পটভূমি এবং বিস্তৃত অপরাধ সাম্রাজ্য।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার পাশে প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত হন টিটন। ঘটনাটি ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে, যেখানে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা খুব কাছ থেকে তাকে এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করে।
যশোরের খড়কি থেকে অপরাধ জগতে উত্থান
টিটনের পৈতৃক বাড়ি যশোর শহরের খড়কি এলাকায়, স্থানীয়ভাবে ‘আপন মোড়’ নামে পরিচিত স্থানে। সাত ভাই ও পাঁচ বোনের বড় পরিবারে জন্ম নেওয়া টিটন অল্প বয়সেই অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়েন। তার ভাই টুটুলও একই পথে হাঁটেন।
স্থানীয়দের দাবি, তাদের অপরাধ জগতে প্রবেশের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসলাম ইমনের, যিনি টিটনের ভগ্নিপতি।
খুন, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে টিটন ও টুটুল যশোরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন তারা।
১৯৯৯ সালে যশোরের কারবালা এলাকায় মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বিএনপি কর্মী মোসলেম উদ্দিন খোকন ও টিপুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
ঢাকায় বিস্তার, অপরাধ ও প্রভাব
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দুই ভাই ঢাকায় চলে আসেন এবং সেখানে বড় অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত হন। টিটন ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হন।
২০২১ সালে প্রকাশিত ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় টিটনের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। একই তালিকায় তার ভগ্নিপতি ইমনের নামও ছিল।
টুটুলের মৃত্যু ও টিটনের একক আধিপত্য
২০০০ সালে র্যাবের কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হন টুটুল। এরপর টিটন ঢাকায় অবস্থান নিয়ে এককভাবে তার অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। যদিও তিনি গোপনে কাজ করতেন, তবুও একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন টিটন।
অস্ত্র চোরাচালান সিন্ডিকেট
স্থানীয়দের অভিযোগ, টিটন যশোর-ঢাকা রুটে একটি শক্তিশালী অস্ত্র চোরাচালান সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে অস্ত্র এনে যশোর হয়ে ঢাকায় সরবরাহ করা হতো। পরে সেগুলো দেশের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো।
পরিবার ও ব্যক্তিজীবন
টিটনের বাবা ফখরুদ্দিন খুলনার একটি জুটমিলের কর্মকর্তা ছিলেন। পরিবারে দুই মা, সাত ভাই ও পাঁচ বোন। টিটন ছিলেন অবিবাহিত। বড় ভাই রিপন তার লাশ ঢাকা থেকে বাড়িতে এনেছেন। বুধবার (২৯ এপ্রিল) এশার পর জানাজা শেষে শহরের কারবার কবরস্থানে টিটনের মরদেহ দাফন করা হয়।
যশোর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান বলেন, টিটনের যশোরে বাড়ি থাকার তথ্য তারা শুনেছেন, তবে তিনি নতুন দায়িত্ব নেওয়ায় বিস্তারিত তথ্য যাচাই করে পরে জানানো হবে।