logo

ভোলার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র যেন নিজেই রোগী

ভোলার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র যেন নিজেই রোগী
ভোলার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। ছবি : এশিয়া পোস্ট

নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে ১৮ ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কথা ভোলার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে। তবে চিকিৎসক ও ওষুধের সংকটে প্রতিষ্ঠানটির সেবাকার্যক্রম কার্যত ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন প্রসূতি ও গর্ভবতী মায়েরা। অন্যদিকে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যে চলছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম।

গাইনি ও অ্যানেসথেশিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে সিজারিয়ান অপারেশন। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ না থাকায় প্রসূতি সেবা নিতে আসা নারীদেরও সব ধরনের ওষুধ দেওয়া যাচ্ছে না। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের ও দরিদ্র পরিবারের রোগীরা।

তবে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

২০ শয্যার এই মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি ভোলার নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিনামূল্যে প্রসূতি ও শিশু চিকিৎসা, স্বাভাবিক প্রসব এবং সিজারিয়ান অপারেশনের অন্যতম ভরসাস্থল। কিন্তু চিকিৎসক সংকট, ওষুধের অভাব ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে প্রতিষ্ঠানটির সেবাকার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে প্রসূতি ও নবজাতকদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।

দূরদূরান্ত থেকে প্রসূতি সেবা নিতে আসা অনেক নারী প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন। সিজারিয়ান অপারেশনের প্রয়োজন হলে গর্ভবতী মায়েদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা বিভাগীয় শহর বরিশালে যেতে হচ্ছে।

ভোলার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পলেস্তরা খসে পড়ে বেরিয়ে এসেছে রড। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ভোলার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পলেস্তরা খসে পড়ে বেরিয়ে এসেছে রড। ছবি: এশিয়া পোস্ট

মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে সেবা নিতে আসা এক প্রসূতির স্বজন সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, আমার মেয়ে গর্ভবতী। গ্রামে ভালো চিকিৎসক ও ওষুধ পাওয়া যায় না। তাই বিনা মূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আশায় মেয়েকে এখানে নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখানে এসে ঠিকমতো ওষুধ পাচ্ছি না, সেবাও মিলছে না। এখন অসুস্থ অবস্থায় তাকে বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসক দেখাতে হবে। আমাদের মতো নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি অনেক কষ্টের। তাই এই সরকারি প্রতিষ্ঠানে একজন গাইনি চিকিৎসক নিয়োগ এবং পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহের দাবি জানাচ্ছি।

বাপ্তা মুসাকান্দি গ্রাম থেকে সেবা নিতে আসা কোহিনুর বেগম বলেন, আমরা গরিব মানুষ। চিকিৎসক দেখাতে এসে যদি চিকিৎসক না পাই, ওষুধ না পাই, তাহলে খুবই কষ্ট হয়। আগে এখানে চিকিৎসা নিতে এলে প্রয়োজন অনুযায়ী এক-দুই পাতা ওষুধ দেওয়া হতো। কিন্তু এখন এলে বলা হয়, ওষুধ নেই।

তিনি আরও বলেন, সন্তান জন্মের পর মা ও নবজাতকের যে ধরনের সেবা প্রয়োজন, সেগুলোও এখন ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। চিকিৎসক না থাকায় অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়া ব্যয়বহুল। টাকার অভাবে অনেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও করাতে পারেন না। এখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ওষুধের ব্যবস্থা করে আগের মতো সবার জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা উচিত।

সেবা নিতে আসা আকলিমা বেগম বলেন, মা ও শিশুর চিকিৎসার জন্য আমরা এখানে আসি। কিন্তু চিকিৎসক না থাকায় অনেক সময় চিকিৎসা পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। আমরা গরিব মানুষ। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার খরচ বহন করা আমাদের জন্য খুবই কষ্টের।

আক্ষেপ করে তিনি আরও বলেন, আগে এখানে চিকিৎসক দেখানোর পর দুই-এক ধরনের ওষুধ পেতাম। এখন বেশির ভাগ সময় কোনো ওষুধই পাওয়া যায় না। শুধু ভিটামিন দেওয়া হয়। অন্য ওষুধ চাইলে বলা হয়, নেই। এখন চিকিৎসকও নেই, ওষুধও নেই। ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেবা নিতে আসতেও ভয় লাগে। সরকার যদি আমাদের দিকে না তাকায়, তাহলে আমাদের মতো অসহায় মানুষের চিকিৎসা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে যাবে।

মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের এমএলএসএস কবীর হোসেন বলেন, আমাদের এখানে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে, কিন্তু চালক না থাকায় সেটি রোগীদের সেবায় ব্যবহার করতে পারছি না। বিশেষ করে প্রসূতি ও জরুরি রোগীদের জন্য অ্যাম্বুলেন্স সেবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চালক নিয়োগ দেওয়া হলে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী এ সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। বর্তমানে অ্যাম্বুলেন্স থাকা সত্ত্বেও শুধু চালকের অভাবে রোগীদের এ সুবিধা দিতে পারছি না।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে কার্যক্রম

প্রায় পাঁচ দশক আগে নির্মিত ভোলা পৌর শহরের থানা মোড়ের পুরোনো ভবনেই চলছে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের কার্যক্রম। জরাজীর্ণ ভবনটির অপারেশন থিয়েটারসহ বিভিন্ন কক্ষের দেয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। স্যাঁতসেঁতে দেয়াল থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। রোগীদের নিরাপদে অবস্থানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি (পিল), প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ইনজেকশনের সরবরাহ না থাকায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। দুইজন চিকিৎসকের বিপরীতে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন একজন চিকিৎসক। তিনিও অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন। অপারেশন থিয়েটার থাকলেও গাইনি ও অ্যানেসথেশিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় প্রায় দুই বছর ধরে সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ রয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক নেই।

মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) ডা. মেহেদী হাসান বলেন, শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কেন্দ্রটির ভবন দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে প্রসূতি রোগীদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী, অপারেশন থিয়েটারের কক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেটি পরিবর্তন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সরবরাহ না থাকায় ওষুধের সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে কিছু ওষুধের ঘাটতি রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত ওষুধ সরবরাহ পাওয়া যাবে। এখানে মেডিকেল অফিসার ও গাইনি চিকিৎসকের পদ থাকলেও চিকিৎসক নেই। একজন গাইনি চিকিৎসক পাওয়া গেলে মা ও শিশুর সেবার মান আরও উন্নত হবে। এসব বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত সমাধানের আশ্বাসও পাওয়া গেছে।

চিকিৎসক ও ওষুধের সংকটের কথা স্বীকার করে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের সহকারী উপপরিচালক ডা. অচিন্ত কুমার ঘোষ বলেন, আমরা মূলত জনবলসংকট, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, চালকসংকট ও ওষুধের সমস্যায় ভুগছি। জনবল না থাকায় রোগীদের সময়মতো কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় রোগী ও সেবাদানকারী উভয়েই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। চালকসংকটের কারণে রোগীদের আনা-নেওয়ায়ও সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি ওষুধ না থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এতে তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এসব বিষয় ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত সমস্যাগুলোর সমাধান করা না হলে জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।