উপহাসের তকমা মুছে শিল্পগৌরব ‘মেইড ইন জিনজিরা’

একসময় কোনো পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই শোনা যেত ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য—‘এটা বুঝি মেইড ইন জিনজিরা!’ সময়ের বিবর্তনে সেই নেতিবাচক ধারণা এখন অতীত ইতিহাস। ঢাকার পাশেই বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে অবস্থিত কেরানীগঞ্জের জিনজিরা আজ দেশের ক্ষুদ্র, কুটির ও হালকা প্রকৌশল (লাইটিং ইঞ্জিনিয়ারিং) শিল্পের এক অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যে নাম একদিন ছিল তাচ্ছিল্যের প্রতীক, আজ তা উদ্ভাবন, কারিগরি দক্ষতা ও আমদানিনির্ভরতা কমানোর এক নতুন সম্ভাবনার পরিচয় বহন করছে।
বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে অবস্থিত জিনজিরার সরু গলি আর ছোট ছোট কারখানাগুলো দিনরাত মুখর থাকে মেশিনের শব্দে। রান্নাঘরের বটি থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার জটিল যন্ত্রাংশ—হাজারো পণ্য তৈরি হচ্ছে এখানকার কারিগরদের হাতের ছোঁয়ায়। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে এসব পণ্য, যার বড় একটি অংশ বিদেশি আমদানির বিকল্প হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইতিহাস বলছে, নবাব আমল থেকেই জিনজিরা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। বুড়িগঙ্গা নদীপথকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে ওঠে পণ্যের বিশাল বাজার। ব্রিটিশ আমলে কাঁচাপাট, লৌহশিল্প, কাঠ, বাঁশ ও টিনজাত পণ্যের জন্য এলাকায় বিশেষ পরিচিতি তৈরি হয়। পাকিস্তান আমলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ শুরু হলেও স্বাধীনতার পর শিল্পভিত্তি আরও সম্প্রসারিত হয়। সাবান, ডিটারজেন্ট, নারিকেল তেল, আলকাতরা, মেলামাইন, তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে নতুন পরিচয় পায় জিনজিরা।

স্থানীয় উদ্যোক্তাদের দাবি, এখানকার কারিগরদের অন্যতম শক্তি হলো তাদের উদ্ভাবনী দক্ষতা। কোনো যন্ত্রাংশের নমুনা হাতে পেলেই অল্প সময়ের মধ্যে তার বিকল্প তৈরি করতে সক্ষম হন তারা। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রপাতিও স্থানীয়ভাবে নির্মাণ করছেন এসব কারিগর।
জিনজিরার তাওয়াপট্টি এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, কৃষিযন্ত্র, বস্ত্রকল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ও বিভিন্ন উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে ছোট ছোট ওয়ার্কশপে। শুধু যন্ত্রাংশ নয়, যন্ত্র তৈরির মেশিনও তৈরি হচ্ছে এখানেই।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, একসময় রিপিট তৈরির অটোমেটিক মেশিন জাপান থেকে আমদানি করতে খরচ হতো ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা। বর্তমানে একই ধরনের মেশিন স্থানীয় কারিগররা তৈরি করছেন আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে। একইভাবে ভারত থেকে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে আমদানি করা স্প্রিং তৈরির মেশিন তাওয়াপট্টিতে তৈরি হচ্ছে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার টাকায়। ফলে শিল্প উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ব্যয় কমছে, পাশাপাশি সাশ্রয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রাও।
জিনজিরার সাফল্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এখানকার মানবসম্পদ। অধিকাংশ কারিগরের নেই কোনো প্রকৌশল ডিগ্রি কিংবা আনুষ্ঠানিক কারিগরি প্রশিক্ষণ। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত জ্ঞানের মাধ্যমেই তারা গড়ে তুলেছেন অসাধারণ দক্ষতা। স্থানীয়দের মতে, এ দক্ষতাই দেশের হালকা প্রকৌশল খাতের অন্যতম চালিকাশক্তি।
প্রতিদিন জিনজিরার বিভিন্ন কারখানা থেকে দেশের নানা অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন ও বিপণন হয় এই এলাকা থেকে। লৌহশিল্পের পাশাপাশি প্লাস্টিকপণ্য, গৃহস্থালি সামগ্রী ও তৈরি পোশাক শিল্পেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে জিনজিরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, জিনজিরার কারিগরদের দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানের। প্রয়োজন শুধু আধুনিক প্রযুক্তি ও সরকারি সহায়তা। তাহলে বিদেশ থেকে আমদানি হওয়া অনেক পণ্যই দেশেই উৎপাদন সম্ভব।
১৬ বছর ধরে মামার লেদমেশিনে কারিগরের কাজ করেন হৃদয়। তিনি বলেন, এখানে যন্ত্রাংশ তৈরিতে ব্যবহৃত হয় নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি মেশিন। যে মেশিন দিয়ে কাজ করি এটা আমার মামার বানানো। যেকোনো ধরনের মেশিন বা তার যন্ত্রের স্যাম্পল (নমুনা) দিলে এখন আমি নিজেই তৈরি করে দিতে পারি। মামার কাছ থেকে দেখে দেখে কাজ শিখে নিয়েছি।
কেরানীগঞ্জ তাওয়াপট্টি ক্ষুদ্র কুটিরশিল্প ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আক্তার জিলানী খোকন বলেন, দেশের হার্ডওয়্যার খাতের বড় একটি অংশের চাহিদা পূরণ করছে জিনজিরার শত শত কারখানা। এতে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি কমছে আমদানিনির্ভরতা।

এসএমই ফাউন্ডেশনের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাসুদুর রহমানের মতে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কর্মকাণ্ডের কারণে একসময় জিনজিরার নাম নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেটিই পুরো এলাকার পরিচয় নয়। তিনি বলেন, দেশের হালকা প্রকৌশল ও ক্ষুদ্র শিল্পখাতে জিনজিরার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা জাতীয় পর্যায়ে আরও বেশি তুলে ধরা প্রয়োজন।
তবে শিল্পের এই বিস্তৃত কর্মকাণ্ডের বিপরীতে শ্রমিক ও কারিগরদের উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাজারো কারখানা ও বিপুলসংখ্যক শ্রমিক-কর্মসংস্থান থাকা সত্ত্বেও জিনজিরাকে ঘিরে সমন্বিত কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
এ বিষয়ে শ্রম অধিদপ্তরের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও পরিসংখ্যান বিভাগের পরিচালক সালাহউদ্দীন মাহমুদ বলেন, কেরানীগঞ্জের জিনজিরাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে কোনো বিশেষ কর্মপরিকল্পনা রয়েছে বলে আমার জানা নেই।