logo

যে ভোট দেয়নি তার জন্যও সরকার হতে চাই: রংপুরে প্রধানমন্ত্রী

যে ভোট দেয়নি তার জন্যও সরকার হতে চাই: রংপুরে প্রধানমন্ত্রী
রংপুরের রাধা গোবিন্দ মন্দির পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: পিএমও ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

রংপুর নগরীর ধর্মসভা রাধাগোবিন্দ মন্দিরে দুর্গাপূজা পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার এমন একটি সরকার হতে চায়, যে ভোট দিয়েছে তারও সরকার হতে চায় আবার যে ভোট দেয়নি তার জন্যও সরকার হতে চায়।’

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে ১২টা ৪৫ মিনিটের দিকে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে মন্দির পরিদর্শন শেষে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে এবং দেশের সব এলাকার সমান উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে রংপুর নগরীট ধর্মসভা রাধাগোবিন্দ মন্দির পরিদর্শন করে ১০ লাখ টাকা অনুদানের চেক মন্দির কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। দুপুর ১২টার দিকে নগরীর প্রেসক্লাব এলাকায় অবস্থিত মন্দিরে পৌঁছান তিনি। সেখানে পূজার্থী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরে পৌনে ১টার দিকে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।

এ সময় তারেক রহমান বলেন, ‘এই দেশটি হাজার বছর ধরে সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে এগিয়ে চলছে, আমরা সবাই মিলে শান্তিতে বসবাস করছি। আমরা চাই বিগত হাজার বছর ধরে যেমন আমরা প্রতিটি ধর্মের মানুষ এই দেশে শান্তিতে একসাথে বসবাস করেছি, আগামী হাজার বছরগুলোতেও যেন আমরা এক সঙ্গে বসবাস করতে পারি।’

সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশ গড়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রিয় ভাইবোনেরা, আগামী দিনে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সব ধর্মমতের মানুষকে এক সঙ্গে দেশের জন্য কাজ করে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। নির্বাচনে সমর্থন দেওয়া-না দেওয়ার পার্থক্য না করে সবার জন্য কাজ করতে চাই। অর্থাৎ, আমরা সব এলাকা বা সব মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।

অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নের বৈষম্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সব এলাকায় সমবণ্টনের মাধ্যমে সমানভাবে উন্নয়ন করতে চাই আমরা। রংপুর মহানগরের উন্নয়নের জন্য এরই মধ্যে একটি বৈঠকে ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার প্রকল্পের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লোকাল গভমেন্টের মাধ্যমে জেলা পরিষদকে দিয়ে আমরা এই জেলা, এই জেলার রংপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলাগুলোতে, বিভিন্ন ইউনিয়নগুলোতে, বিভিন্ন গ্রামগুলোতে মানুষের প্রয়োজনে যে ইনফ্রাস্ট্রাকচার দরকার, ব্রিজ-কালভার্ট দরকার, স্কুল-কলেজ দরকার সেগুলো ইনশাআল্লাহ আমরা পর্যায়ক্রমিকভাবে গড়ে তুলব। যেন মানুষ রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা পেতে পারে।

এ কাজ বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই কাজগুলো যদি করতে হয়, তাহলে আমাদের সবাইকে এক সঙ্গে করতে হবে। আমাদের ভেতরের ভেদাভেদকে ভুলে থাকতে হবে। এই কাজগুলো যদি করতে হয়, আমাদেরকে একসাথে হাত ধরে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। যদি কিছু বলার থাকে, জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদ গঠন করেছে, সেই সংসদে জনগণ তাদের প্রতিনিধিদেরকে পাঠিয়েছে। আপনাদের যদি কিছু বলার থাকে, যদি কিছু তুলে ধরার থাকে, আসুন আমরা সংসদে সেই কাজটি করি, জনগণ রাষ্ট্রের পক্ষে যেটি ভালো হবে সেই সিদ্ধান্ত আমরা গ্রহণ করি।’

রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত না করার ওপরও গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা অতীতের মতো এমন কোনো পরিস্থিতি যেন তৈরি না করি, যাতে করে জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, সন্তানদের শিক্ষাক্ষেত্র, স্বাস্থ্য সুবিধা, জনগণের ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি এগুলোতে কোনোভাবে ব্যাঘাত ঘটে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে জনগণ দেশে একটি স্থিতিশীলতা চায়, জনগণ চায় শান্তিতে থাকতে, জনগণ চায় নিরাপদে থাকতে এবং বর্তমান সরকার তার জন্যই কাজ করছে।’

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে, দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চাই। সর্বপরি আমরা দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য যেভাবে প্রয়োজন সেভাবেই সবাই মিলে কাজ করব।’

দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি মহল বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সাথে একটি কথা বলতে হয়, কিছুদিন যাবৎ আমরা দেখেছি, আমরা যেই ঐক্যটি তৈরি করতে চাচ্ছি, বর্তমান সরকার সকলকে নিয়ে যেখানে চলতে চাইছে। কিন্তু একটি মহল বিভিন্ন রকম বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।’

মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা দেখেছি অতীতে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কেউ একজন বিতাড়িত করতে চেয়েছিল, কোনো একটি দল বিতাড়িত করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই ফলাফলটা খুব শুভ হয়নি, বাংলাদেশের মানুষ সেই ফলাফলটিকে বা সেই লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যটিকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। ঠিক একইভাবে আমরা দেখেছি ২৪-এর যে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, সেই গণঅভ্যুত্থান থেকেও কোনো কোনো মহল বিতাড়িত করার চেষ্টা করছে।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে জনগণ। এই জনগণকে আমরা বর্তমান সরকার অতীতের মতন বর্তমানেও পাশে পেতে চাই।’

মন্দিরের পেছনে নির্মাণাধীন একটি স্থাপনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে আর্থিকভাবে অসচ্ছল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিনা মূল্যে থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গ্রাম থেকে শহরে আসা ব্যক্তিদের আবাসনের সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্থাপনাটি নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তারেক রহমান বলেন, ‘আমার এর পেছনে বোধহয় একটি হোস্টেলের মতো একটি স্ট্রাকচার আছে, যেখানে সনাতনী সম্প্রদায়ের যারা মানুষ আছে যারা অবস্থাপন্ন নয়, যাদের জন্য হয়তো গ্রামগঞ্জ থেকে এসে এখানে শহরে থাকা একটু কষ্টকর, তাদের জন্য এখানে বিনামূল্যে থাকার ব্যবস্থা মন্ত্রীপরিষদ তৈরি করছে।’

নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ করতে আরও অর্থের প্রয়োজন রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এরই মধ্যে সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছি এবং একই সাথে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে আমি নির্দেশনা দিয়েছি যে, পর্যায়ক্রমিকভাবে আগামী দুই বছরের মধ্যে যাতে এই কাজটা সম্পূর্ণ হয়।’

বক্তব্যের শেষে দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ ও প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

এর আগে মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে সামরিক বিমানে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে সড়কপথে রংপুরে যাওয়ার পথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীরে পথসভায় বক্তব্য দেন তিনি। ধর্মসভা মন্দিরে পৌঁছানোর সময় সড়কের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক মানুষ তাঁকে স্বাগত জানান।

প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে রংপুর নগরীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পাশাপাশি গত পাঁচ দিন ধরে নগরের বিভিন্ন সড়কে পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যবর্ধন ও সংস্কারকাজ চলে। রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের পাগলাপীর থেকে মেডিকেল মোড় পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়ক মেরামত করা হয়। নগরের ডিসির মোড় থেকে লালকুঠির মোড় পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ১৫০ মিটার সড়কও সংস্কার করা হয়। তবে সফরের আগে দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ করায় এর মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রংপুরের কর্মসূচি শেষে একই দিনে রাজশাহী ও চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের কর্মসূচি ছিল প্রধানমন্ত্রীর।