Advertisement

নাটোরে বিদ্যুৎ যেন ‘অতিথি’, দেড় ঘণ্টা পর আসলেও মুহূর্তেই যায়

এশিয়া পোস্ট নিউজ, নাটোর
নাটোরে বিদ্যুৎ যেন ‘অতিথি’, দেড় ঘণ্টা পর আসলেও মুহূর্তেই যায়
ছবি : এশিয়া পোস্ট

নাটোরে বিদ্যুতের তীব্র লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। জমিতে সেচ দিতে গিয়ে চরম সমস্যায় পড়ছেন কৃষকেরা। পড়াশোনা, দৈনন্দিন কাজকর্ম ও ব্যবসাবাণিজ্যসহ সবক্ষেত্রেই স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। দিন-রাতের অধিকাংশ সময়ই চলছে লোডশেডিং। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে কমপক্ষে দেড় থেকে দুই ঘণ্টার আগে আর আসে না। এতে সেচ পাম্প নষ্ট হওয়া সহ নানা ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রামগঞ্জের মানুষ। এই যন্ত্রণা থেকে দ্রুত মুক্তি চান সবাই। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সামান্য কিছু ঘাটতি থাকলেও দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হবে।

Advertisement

নাটোর জেলার অধিকাংশ এলাকা পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন। গ্রামাঞ্চলের মানুষের একমাত্র ভরসা পল্লী বিদ্যুতের সরবরাহ। জেলায় প্রায় শতভাগ গ্রাম বিদ্যুতের আওতায় এলেও গ্রাহকেরা সঠিক সেবা পাচ্ছেন না। শিক্ষা, দৈনন্দিন কাজ, ব্যবসাবাণিজ্য ও কৃষিকাজে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। অথচ অনবরত লোডশেডিংয়ের কারণে কোনো কাজই ঠিকভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না।

হালতি বিলের কৃষক আব্দুর রশীদ, সাকিব হোসেন ও আব্দুল লতিফ এবং বাগাতিপাড়ার তমালতলা গ্রামের শিপন আহমেদ, রওনক রহমান ও শহিদুল ইসলামসহ অনেকেই জানান, তারা জমিতে বিভিন্ন ফসলের আবাদ করেন। এ কারণে ইরিগেশন মোটরের সাহায্যে জমিতে পানি দিতে হয়। কিন্তু এক থেকে দেড় বিঘা জমিতে সেচ দিতে না দিতেই বিদ্যুৎ চলে যায়, যা ফিরে আসে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর। ফলে পানি সেচ দিতেই দিনের সিংহভাগ সময় পার হয়ে যাচ্ছে, অন্য কাজ করার সুযোগ থাকছে না। বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করায় ইলেকট্রিক মোটর নষ্ট হয়ে যায়। তা মেরামত করতে তিন-চার দিন সময় লাগার পাশাপাশি বাড়তি অর্থ খরচ হয় এবং ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়।

কৃষকেরা জানান, সকালে সেচ দিতে গিয়ে ৩-৪ বার বিদ্যুতের বিভ্রাটে পড়তে হয়েছে। এভাবে লোডশেডিং চলতে থাকলে মোটরের ক্ষতি হয় এবং তা মেরামতের সময় জমিতে পানির অভাবে ফাটল ধরে। পরবর্তীতে সেচের জন্য আরও বেশি পানির প্রয়োজন হয়। আগে মোটর চালু করে কৃষকেরা অন্য কাজ করতে পারতেন, এখন মোটরের পাশেই বসে থাকতে হয়। সঠিক সময়ে পানি দিতে না পারায় সময়মতো ফসল ঘরে তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

অটোরিকশাচালক রাজকুমার কর্মকার বলেন, বিদ্যুতের সংকটে তিনি ঠিকমতো রিকশা চালাতে পারছেন না। রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারি চার্জ দেওয়া সম্ভব হয় না, ফলে দিনে কাঙ্ক্ষিত সময় রিকশা চালানো যাচ্ছে না। রিকশা চালিয়ে যা আয় হয় তা দিয়েই তার সংসার চলে। বর্তমানে দিনে জমা দেওয়ার টাকাই উঠছে না।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মাসুম হোসেন, লোকমান আলী ও আলমসহ অন্য ব্যবসায়ীরা জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে দোকানে কাজ করতে চরম অসুবিধা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে গ্রাহকদের ডেলিভারি দেওয়া যাচ্ছে না, যার ফলে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। দোকানের আয়ে যাদের সংসার চলে, লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের ব্যবসা এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এ ছাড়া পুরো মাসজুড়ে বিদ্যুৎ না থাকলেও মাস শেষে বিল কিন্তু কম আসছে না, বরং আগের চেয়ে বেশি আসছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

শহরের কানাইখালী এলাকায় ফটোকপির দোকানে আসা রঞ্জু ইসলাম নামের এক গ্রাহক জানান, জরুরি প্রয়োজনে কাগজ ফটোকপি করতে এসে তিনি ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় ঘণ্টায় পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সঠিক সময়ে কাজ না হলে পরদিন আবার আসতে হবে।

সদর উপজেলার মদনহাট গ্রামের গৃহবধূ রূপা খাতুন, পিংকি খাতুন ও জান্নাতুন নেছাসহ অনেকেই জানান, সকালে ঘুম থেকে উঠে সন্তানদের স্কুলের জন্য নাশতা তৈরি করতে হয়। কিন্তু সকাল থেকেই বারবার বিদ্যুৎ চলে যায়। সারাদিনের কাজ শেষে ফ্যানের বাতাসে একটু বিশ্রামের সুযোগটুকুও মিলছে না। গরমে রাতে ঘুম হয় না। বিদ্যুৎ যেন কেবল আসা-যাওয়ার খেলা খেলছে।

সদর উপজেলার হালসা ইউনিয়নের পারখোলাবাড়িয়া গ্রামের ফরিদ দেওয়ান জানান, তার বাড়িতে অসুস্থ বৃদ্ধা মা রয়েছেন। তীব্র গরমের কারণে তাকে ঘরে রাখা যেমন কঠিন, তেমনি বাইরে নিয়ে বসিয়ে রাখাও সম্ভব নয়। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে চার্জার ফ্যান কিনেছেন, কিন্তু সেটি চার্জ দেওয়ার জন্যও তো বিদ্যুৎ প্রয়োজন। তাই তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

শহরের ফৌজদারিপাড়া মহল্লার ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রাকেশ পাল জানান, তারা গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে বাড়তি খরচের মুখে পড়ছেন তারা।

নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জেনারেল ম্যানেজার টি এম মেজবাহ উদ্দিন জানান, নাটোর গ্রিড ও রাজশাহীর কাটাখালী গ্রিড—এই দুটি উৎস থেকে নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এই সমিতির দৈনিক পিক ডিমান্ড প্রায় ১১০ মেগাওয়াট। বর্তমানে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো। শুধু দুটি নির্দিষ্ট সময়ে সামান্য ঘাটতি রয়েছে। খুব দ্রুতই এই সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিষয় :