৯ বছরে ফেরেনি একজনও, কোন পথে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান?

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার সময় মোহাম্মদ হারেজের বয়স ছিল ১৭ বছর। এখন তার বয়স ২৬। চার সন্তানের জনক হারেজ নয় বছর ধরে উখিয়ার ১৮ নম্বর ক্যাম্পের একটি ছোট্ট ঘরে শরণার্থী জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি এই ক্যাম্প জীবনের অবসান চান, ফিরতে চান নিজ দেশে।
হারেজ বলেন, ‘মিয়ানমারের মনিরকুল গ্রামে আমার ৪০ কানি জমি, ৫০টি মহিষ আর ৩০টি গরু ছিল। সেখানে ছিলাম রাজার হালে। এখানে আসার পর থেকে বহুবার ফেরার কথা শুনেছি, তালিকা তৈরির খবরও জেনেছি। কিন্তু বাড়ি ফেরার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। আমরা শরণার্থী হয়ে আর থাকতে চাই না।’
শুধু হারেজ নন; উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে আশ্রিত ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গার জীবন অনেকটাই বন্দি। আজ শনিবার (২০ জুন) বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস। এই দিবসকে সামনে রেখে আবারও আলোচনায় এসেছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি, যা ২০২৬ সালে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারের জন্য অন্যতম বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

একই ক্যাম্পের বাসিন্দা ৮৮ বছর বয়সি ইমান আলী বলেন, ‘নিজ দেশে ধান চাষ, পানের বরজসহ বিভিন্ন চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতাম। সেখানে সুখে ও সুস্থ ছিলাম। এখন ক্যাম্পে বেশির ভাগ সময় অসুস্থ থাকি।’ তার স্ত্রী খতিজা বেগম বলেন, ‘এখানে খুব কষ্টে আছি। রোদে পুড়ছি, বৃষ্টিতে ভিজছি। দেশে আমাদের গাছপালা, চাষাবাদ ও স্বাভাবিক জীবন ছিল। সেসব কথা মনে পড়লে কান্না পায়।’
নয় বছরেও শুরু হয়নি প্রত্যাবাসন
সম্প্রতি সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, সরকার ছয় ধাপে মোট ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৫০৩ জনের তথ্য যাচাই করা হলেও এখন পর্যন্ত কাউকেই ফেরত নেয়নি দেশটি।
এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে নতুন করে ১ লাখ ৫২ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের এখনও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তবে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কাজ করছে।’
বিফলে ড. ইউনূসের প্রতিশ্রুতি
২০২৫ সালের ১৪ মার্চ জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছিলেন। সে সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে পরবর্তী বছরে নিজ দেশে রোহিঙ্গাদের ঈদ উদযাপনের আশা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সেই আশ্বাসের কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সভা-সেমিনার অনেক করেছে, কিন্তু কাজের কাজ হয়নি। চীনকে বাদ দিয়ে কক্সবাজার, জাতিসংঘ ও কাতারে একাধিক সেমিনারের বিষয়টিকে বেইজিং ভালোভাবে নেয়নি। রোহিঙ্গা ইস্যু দ্বিপাক্ষিক বা চীনকে সম্পৃক্ত করে ত্রিপাক্ষিকভাবে সমাধানের সুযোগ ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ যখন এটিকে বহুপাক্ষিক করেছে, তখন চীন মিয়ানমারের পক্ষ নিয়েছে।’
নতুন সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার ও চ্যালেঞ্জ
ক্ষমতাসীন বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধানকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘শুরুতে এটি মানবিক সংকট হলেও এখন এটি জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। আমরা বিশ্বাস করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ ও মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব সম্পর্ক উন্নত করা যায়, প্রত্যাবাসন তত সহজ হবে। বর্তমান সরকার এই সমস্যা দ্বিপাক্ষিকভাবে সমাধান করবে, নাকি বহুপাক্ষিকভাবে আরও জটিল করবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।’
কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা, বাড়ছে স্থানীয়দের চাপ
চলতি বছরের গত ১ এপ্রিল থেকে পরিবারভেদে ৭, ১০ ও ১২ ডলার হারে মাসিক খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ঘাটতির কারণেই এই পরিবর্তন এনেছেন তারা। এদিকে রোহিঙ্গাদের জন্য যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (জেআরপি) ২০২৬ সালের জন্য ৭১০ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ১ কোটি ৪০ লাখ ইউরো সহায়তা ঘোষণা করেছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, প্রতি বছর ২০ থেকে ৩০ হাজার নতুন রোহিঙ্গা যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ন্যূনতম জীবনযাপনের ব্যবস্থা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশের যোগাযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের টিকে থাকা ও ভবিষ্যতের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারাবাহিক সহায়তা জরুরি। নিরাপদ প্রত্যাবাসনের সুযোগ পেলে তারা নিজেদের জীবন পুনর্গঠন করতে পারবে।’
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে উখিয়া-টেকনাফের সামাজিক কাঠামো, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন দাবি করেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্যের কারণে প্রায় ৩০০ একর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে।
অপরাধ কমলেও কাটেনি আতঙ্ক
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক পাচার, মানবপাচার ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখনও উদ্বেগের বিষয় হলেও হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমছে। ক্যাম্পে ২০২৩ সালে ৬৬টি খুনের ঘটনা ঘটলেও ২০২৪ সালে তা ৪৯টি এবং ২০২৫ সালে ৩৫টিতে নেমে আসে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৬টি।
উখিয়ার ১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মোহাম্মদ সিরাজ আমীন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের অনেকেই নিরীহ। অধিকাংশ অপরাধ ঘটে তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে। ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।’