logo

নকশিকাঁথায় স্বপ্ন বুনছেন জামালপুরের নারীরা

নকশিকাঁথায় স্বপ্ন বুনছেন জামালপুরের নারীরা

ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন জামালপুরের গ্রামীণ নারীরা। দিনরাত সুই-সুতো হাতে নকশিকাঁথা সেলাইয়ে ব্যস্ত তারা। বাড়তি অর্ডারের চাপ সামলাতে অনেকেই গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করছেন, যেন সময়মতো ক্রেতার হাতে তুলে দিতে পারেন তাদের যত্নে বোনা কাঁথা ও অন্যান্য সামগ্রী।

বিকেল হতেই জামালপুরের গ্রামগুলোতে শুরু হয় অন্যরকম এক ব্যস্ততা। উঠানজুড়ে গোল হয়ে বসে কাথা বুনতে বসেন নারীরা। কারও কোলে রঙিন সুতো, কারও হাতে আধা-তৈরি কাঁথা। সুইয়ের নরম টানে কাপড়ের বুকে ফুটে ওঠে ফুল, লতা-পাতা, নদী, নৌকা কিংবা গ্রামীণ জীবনের টুকরো ছবি।

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা শিল্পে জামালপুরের অবস্থান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পেয়েছে জিআই পণ্যের স্বীকৃতিও। জানা গেছে, জেলার সাতটি উপজেলায় এক লাখের বেশি নারী নকশিকাঁথা ও সংশ্লিষ্ট পণ্য তৈরির সঙ্গে যুক্ত। রয়েছে চার শতাধিক সমিতি। নকশিকাঁথার সুতায় তাই এখন শুধু ঐতিহ্যের গল্প নয়, বোনা হচ্ছে আত্মনির্ভরতা আর সম্ভাবনার নতুন অধ্যায়।

এই নকশিকাঁথা শুধু কারুকাজ নয়, এ যেন তাদের না বলা গল্প, না পাওয়া স্বপ্ন। শতবছর আগে গ্রামের নারীদের শখের বসে করা এই কাজ এখন হয়ে উঠেছে আয়ের প্রধান উৎস। নকশিকাঁথা ধরে রেখেই বদলে যাচ্ছে জেলার জামতলীসহ বিভিন্ন গ্রামের হাজারো নারীর ভাগ্য।

জামতলীসহ জেলার বিভিন্ন গ্রামের নারীরা দলবেঁধে কাজ করেন। অনেকেই সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি সন্তানের পড়াশোনার ব্যয়ও মেটাচ্ছেন এই আয়ে। একটি নকশিকাঁথা তৈরি করতে সময় লাগে দুই থেকে তিন মাস। নকশা ও কারুকাজ ভেদে প্রতিটির দাম ৩ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

শুধু কাঁথাই নয়, এখন শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, বেড কভারসহ নানা পণ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এই শিল্পের ছোঁয়া। স্থানীয় হস্তশিল্পের দোকান ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এসব পণ্য দেশ-বিদেশে যাচ্ছে।

জামতলী গ্রামের গৃহবধূ রহিমা খাতুন বলেন, আগে স্বামীর আয়ের ওপরই পুরো সংসার চলত। অনেক সময় টানাপোড়েন হত। এখন আমি মাসে ৮-১০ হাজার টাকা আয় করি। মেয়ের স্কুলের খরচটা নিজের হাতে দিতে পারি; এই আনন্দের দাম টাকা দিয়ে মাপা যায় না।

আরেক কারিগর সালমা বেগম বলেন, এই কাঁথার টাকায় আমার ছেলেটা কলেজে পড়ে। রাত জেগে সেলাই করি, তবু কষ্ট লাগে না। মনে হয় প্রতিটা ফোঁড়ে ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ে দিচ্ছি।

দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ নারীদের সঙ্গে কাজ করছেন স্কুলশিক্ষিকা সাবেরা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, গ্রামের পিছিয়ে পড়া গৃহবধূ ও শিক্ষার্থীদের আমরা বিভিন্ন দোকান ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যুক্ত করেছি। এতে তারা ঘরে বসেই আয় করতে পারছেন।

জামালপুর উদ্যোক্তা ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা দোলন সোমা বলেন, জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর জামালপুরের নকশিকাঁথার চাহিদা আরও বেড়েছে। এতে বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে। শহরজুড়ে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন হস্তশিল্পের দোকান। সরকারও এ শিল্পের উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

মিনারা পরভিন মিনা বলেন, চাকরির পাশাপাশি ২০১৬ সাল থেকে তিনি অনলাইনের মাধ্যমে জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা বিক্রি করছেন। শুরুতে ছোট পরিসরে কাজ শুরু করলেও বর্তমানে তার অধীনে ৯টি টিম কাজ করছে।

এসব টিমে গ্রামের অনেক নারী যুক্ত হয়ে নকশিকাঁথা তৈরি করছেন, যার মাধ্যমে তারা ঘরে বসেই আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। এই ব্যবসার মাধ্যমে প্রতি বছর সরকারকে নিয়মিত ট্যাক্সও পরিশোধ করছেন মিনারা পরভিন। তিনি বলেন, জামালপুরের নকশিকাঁথা এখন শুধু স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের বিভিন্ন জেলায় এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক মঞ্জুর আলম বলেন, নারীদের প্রশিক্ষণ, মানোন্নয়ন ও বাজারজাতকরণে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এতে নারীরা সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত হচ্ছে।