logo

‘মাদক কারবারির’ ঝুপড়ি ঘরে এসি, নজরদারির জন্য সিসি ক্যামেরা

‘মাদক কারবারির’ ঝুপড়ি ঘরে এসি, নজরদারির জন্য সিসি ক্যামেরা
মাদক কারবারের জন্য ঝুপড়ি ঘরে লাগানো হয়েছে এসি। ইনসেটে ববিতা আক্তার সুমাইয়া। ছবি: এশিয়া পোস্ট

নোয়াখালীর চাটখিল পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ভীমপুর গ্রামের সরকারি খাসজমিতে গড়ে ওঠা বেদেপল্লির একটি ঘর নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। বাইরে থেকে সাধারণ ঝুপড়ি ঘরের মতো দেখালেও ভেতরে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) ব্যবস্থা এবং চারপাশে স্থাপন করা হয়েছে একাধিক সিসি ক্যামেরা।

বেদেপল্লির আর দশটা সাধারণ ঝুপড়ি ঘরের মতোই একটি ঘর। কিন্তু ভেতরে পা রাখলেই চোখ কপালে ওঠার দশা! বাঁশ আর চালের ছাউনির আড়ালে এক রাজকীয় ও বিলাসবহুল জীবনযাপন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওই ঘর থেকেই পরিচালিত হচ্ছে একটি মাদক কারবারের নেটওয়ার্ক।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বেদেপল্লির ওই আস্তানার নিয়ন্ত্রক ববিতা আক্তার সুমাইয়া। তার বিরুদ্ধে চাটখিল থানায় একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। পুলিশ বিভিন্ন সময় তাকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করলেও জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেদেপল্লির ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু চাটখিল নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও ক্রেতারা সেখানে আসেন। অনেকে মাদক কিনে নিয়ে যান, আবার কেউ কেউ সেখানে বসেই সেবন করেন। ফলে এলাকার কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাসিন্দারা।

পুলিশ বিভিন্ন সময় ববিতাকে মাদকসহ গ্রেপ্তার করেছে। ছবি: সংগৃহীত
পুলিশ বিভিন্ন সময় ববিতাকে মাদকসহ গ্রেপ্তার করেছে। ছবি: সংগৃহীত

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, দিন-রাত বিভিন্ন বয়সি মানুষের আনাগোনা দেখা যায়। দূর-দূরান্ত থেকেও লোকজন আসেন। অনেকেই ভয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে চান না।

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে চাটখিল পৌরসভা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বি কে হানিফ বলেন, একজন মাদক কারবারির কাছে পুলিশ, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়বে—এটি মেনে নেওয়া যায় না। ববিতার এত প্রভাবের উৎস কোথায়, তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন। তার পেছনে যারা রয়েছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা লুৎফর হায়দার অভিযোগ করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা অপরিচিত কারও উপস্থিতি টের পেলেই মাদক কারবারিদের সহযোগীরা সতর্ক হয়ে যান। অতীতে অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় লোকজন হামলার শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

চাটখিল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুল কানন বলেন, বেদেপল্লিতে গড়ে ওঠা মাদক সিন্ডিকেটের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং অবৈধ আস্তানাটি উচ্ছেদ করে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে পারে প্রশাসন। তার মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এলাকার সামাজিক পরিবেশ ও তরুণ সমাজ আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

পুলিশ সূত্র জানা গেছে, ববিতা আক্তারের বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।

অভিযুক্ত ববিতা আক্তার সুমাইয়াকে ফোন করা হলে এ বিষয়ে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাটখিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মোন্নাফ বলেন, ববিতার নামে থানায় একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। সম্প্রতি তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। তবে তার জীবনযাপনের ধরন বা ঘরে এসি ও সিসিটিভি স্থাপনের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। মাদকসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।

চাটখিল পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজানুর রহমান বলেন, যে স্থাপনাটি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, সেটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের জায়গায় অবস্থিত। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, শুধু স্থাপনা উচ্ছেদ করাই নয়, যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অন্য কোথাও গিয়ে একই ধরনের অবৈধ কার্যক্রম, বিশেষ করে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করতে না পারেন, সে বিষয়েও প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।