ভাঙচুর করা বাড়িতে আতঙ্কে কেটেছে শিশু আরাফাতের ঈদ

জড়সড়ো হয়ে ঘুমাচ্ছে আহত শিশু আরাফাত, পাশে বসে আছেন মা। শিশুটির এই ঘুম দেখলে যে কেউ বলে দিতে পারবে- কতটা ক্লান্তি তার চোখে-মুখে। হামলাকারীদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি দুই বছরে শিশু আরাফাত। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সেও হামলার শিকার হয়ে আহত হয়েছে। অবুঝ এই শিশু ঘুমিয়ে আছে তাদের ভাঙচুর করা বাড়িতে। এবার পরিবারের সকল সদস্যের ঈদ কেটেছে এই ভাঙা বাড়িতেই।
ঈদের আগের দিন ২০ মার্চ সকালে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার শিবু মার্কেট পশ্চিম লামাপাড়া এলাকার মো. ফারুকের বাড়িতে এই হামলার ঘটনা ঘটে। তখন প্রায় পরিবারের সকল সদস্যই গভীর ঘুমে। হঠাৎ হামলায় ঘুম ভাঙে তাদের।
জানা গেছে, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে চাচাতো ভাইসহ স্বজনরা ভাড়া করা লোক নিয়ে এই হামলা চালায়। এ সময় বাড়ির সাতটি কক্ষের দরজা-জানালাসহ ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। এমনকি বাড়ির দেয়ালগুলো শাবল দিয়ে ভাঙা হয়। লুটপাট করে নিয়ে যায় ঘরে থাকা জিনিসপত্র।
হামলায় ফারুক, তার স্ত্রী, দুই বছরের শিশু সন্তান আরাফাত, মা-বাবা এবং বোন আহত হন। এ ছাড়া প্রায় ৪০-৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি তাদের।
ঘটনার সময় ভুক্তভোগীর পরিবার জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করলে ফতুল্লা থানা থেকে পুলিশ পাঠানো হয়। কিন্তু পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে প্রায় তিন ঘণ্টা পর।
গোপনে ধারণ করা হামলার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ফারুকের চাচাতো ভাই রুবেল, আনোয়ার হোসেন, ফিরোজা, আনিসসহ অর্ধশতাধিক লোক হামলায় অংশ নেন। তারা বাড়ির সাতটি ঘর ভাঙচুর করে সকল আসবাবপত্র লুটপাট করে নিয়ে যায়।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, বেশ কিছুদিন ধরে ফারুকের চাচাতো ভাই এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে ওয়ারিশের জমি ও সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। তার জেরে ফারুকের পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন চাচাতো ভাই রুবেল। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অর্ধশতাধিক লোকজন নিয়ে তাদের থাকার বাড়িঘর ভাঙচুর করে জিনিসপত্র লুটপাট করে নিয়ে যায়।
ভুক্তভোগী ফারুক বলেন, আমার চাতো ভাই রুবেল ও তার পরিবারের সদস্যরা আমার কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন। আমি সেই টাকা দিইনি বলে তারা আমার বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করে। আমার আনুমানিক ৪০-৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। আমি এই হামলার দ্রুত বিচারের দাবি জানাই।
রুবেলের বোন বলেন, রুবেল ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। সেই টাকা আমরা দিতে পারি নাই। তাই তারা সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে আমাদের বাড়িঘরে হামলা করেছে। পরিবারের সবাইকে মারধর করছে, আমাকেও মারছে। এখন আমাদের বাড়িতে থাকার মত কোনো কিছু নাই, সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে গেছে। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই। আমরা সবাই আতঙ্কে আছি, তারা বিভিন্নভাবে আমাদের হুমকি দিচ্ছে।
শিশু আরাফাতের মা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বাসায় কোথাও একটু শোয়ার জায়গা নাই, আমার ছেলেকে কোথায় শোয়াবো। সন্ত্রাসীরা আমাদের বাড়িঘরের সবকিছু ভাঙচুর করে রাখছে। তাই এই ময়লার মধ্যেই আমার সন্তানকে শুইয়ে রাখছি, সন্ত্রাসী বাহিনী আমার ছেলেকেও আঘাত করেছে, তার গাল কেটে রক্ত পড়েছে। সন্ত্রাসীদের নিয়ে আমাদের সবাইকে মেরে আহত করছে, আমি ভিডিও করেছি দেখে আমাকে ধাক্কা দিয়ে গেটের বাইরে ফেলে দিয়েছে। আমার মোবাইল তারা জোর করে নিয়ে গেছে।’

ঘটনার পর থেকে গা-ঢাকা দিয়েছেন অভিযুক্তরা। তাই এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রুবেল, আনোয়ার হোসেন ও ফিরোজাকে একাধিকবার ফোন করা হয়, কিন্তু তারা ফোন ধরেননি।
এ বিষয়ে ফতুল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত (ওসি) এম এ মান্নান বলেন, ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় একটি অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মামলা নেওয়া হয়েছে। তদন্ত করে হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করে পরবর্তীতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশন ও অপরাধ) তারেক আল মেহেদী বলেন, গতকাল রোববার (২২ মার্চ) মামলা নেওয়া হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এখন আমাদের কাজ আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো।