logo
Advertisement
জামালপুর পৌর নির্বাচন

বিএনপির কোন্দল কাজে লাগাতে চায় জামায়াত-এনসিপি

বিএনপির কোন্দল কাজে লাগাতে চায় জামায়াত-এনসিপি
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির লোগো। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

জামালপুর পৌরসভার ভোট কবে হবে— সে উত্তর এখনো অজানা। নির্বাচন কমিশনও তপশিল ঘোষণা করেনি। তবুও সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপে গরম হয়ে উঠেছে শহরের রাজনীতি। এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জনের বেশি নেতার নাম আলোচনায় এসেছে। তপশিল বা ভোটের তারিখ না থাকলেও নীরব এই প্রতিযোগিতায় নির্বাচনি আমেজ বিরাজ করছে শহরজুড়ে।

উঠান বৈঠক, গণসংযোগ, ব্যানার-পোস্টার আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব উপস্থিতিতে প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন প্রার্থীরা। বিশেষ করে জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে একাধিক বলয় তৈরি হওয়ায় তাদের কোন্দল প্রকাশ্যে এসেছে। আর এই দলীয় বিভাজনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে মাঠে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে তৎপর হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।

পৌরসভার তথ্য মতে, প্রথম শ্রেণির জামালপুর পৌরসভার আয়তন ৫৩ দশমিক ২৮ বর্গকিলোমিটার। পৌরসভার জনসংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮৯ জন। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৯৬ হাজার ৩৫৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৪৬ হাজার ৯১৩ জন এবং নারী ভোটার ৪৯ হাজার ৪৪৪ জন। পৌরসভায় রয়েছে ১২টি ওয়ার্ড, ৭৬টি মহল্লা এবং ৪২টি ভোটকেন্দ্র।

দলীয় সূত্র ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জামালপুরে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির অন্তত ৮ থেকে ১০ জন নেতা সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন জেলা যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা খান ও শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ মোহম্মদ মাসুদ। তাদের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পোস্টার, ব্যানার, গণসংযোগ ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছেন।

আলোচনায় যাদের নাম

বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে জেলা যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা খান শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তরুণ কর্মীদের মধ্যে তার সক্রিয় যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক উপস্থিতি তাকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রেখেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

অন্যদিকে শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. আব্দুলাহ আল মাসুদ মাঠ পর্যায়ে গণসংযোগ, দলীয় কর্মসূচি এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগের কারণে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন। তিনি জামালপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী মামুনের ছোট ভাই।

এ ছাড়াও জিএস ফিরোজ আহমেদ, রিশাদ রোদোয়ান বাবু, শামীম আহমেদ, শুভ পাঠানসহ আরও কয়েকজন নেতার নাম সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছে। তাদের মধ্যে বিভিন্ন বলয় থেকে একাধিক প্রার্থীর নাম আলোচনায় থাকায় বিএনপির ভেতরেই মনোনয়ন নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।

৫ আগস্টের পর বিরোধ অনেকটাই প্রকাশ্যে আসে

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জেলা বিএনপির অভ্যন্তরে নেতৃত্বের প্রশ্নে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি নিরসন হয়নি। জেলা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে একাধিকবার পাল্টাপাল্টি অবস্থান, বিক্ষোভ, মশাল মিছিল এবং সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও-ভিডিও বার্তা, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ দলীয় বিভক্তিকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। মেয়র নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই বিভক্তি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

দলীয় সূত্র বলছে, জেলা পর্যায়ের নেতৃত্ব, সাবেক পদধারী নেতা, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুসারীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেই মূলত এই বিভাজন তৈরি হয়েছে। যদিও কেন্দ্রীয় নেতারা বারবার সাংগঠনিক ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন, তবুও তৃণমূল পর্যায়ে সেই বিভক্তির প্রভাব এখনো দৃশ্যমান।

ভোটারদের ভাবনা

শহরের নতুন ভোটার মো. সাকিব হাসান বলেন, আমরা তরুণ ভোটাররা এবার ব্যক্তি নয়, কাজ দেখেই ভোট দিতে চাই। শহরের যানজট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা এবং কর্মসংস্থান নিয়ে যার বাস্তব পরিকল্পনা থাকবে, তাকেই সমর্থন করব।

নতুন ভোটার নুসরাত জাহান বলেন, শুধু পোস্টার আর শোডাউন দেখে ভোট দেব না। আমরা চাই এমন একজন মেয়র, যিনি নারী, শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য কাজ করবেন। দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি যোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ।

পলাশতলার ভোটার আজিজুল হক বলেন, অনেক তো ভোট দিয়েছি। কিন্তু যা দিয়েছি তাতে শুধু নেতাদের লাভ হয়েছে। আমাদের কোনো খোঁজ রাখেনি কেউ। ভোট নেওয়ার আগে সবাই আসে ভোটাভোটি শেষে সব শেষ। আমাদের দীর্ঘ দিনের পানি দুর্ভোগ কেউ দেখে না।

শহরের রিকশা চালক মিজানুর রহমান বলেন, শহরে প্রচুর রিকশা হয়ে গেছে। আমরা বাইরের রিকশার জন্য শহরের মানুষ রিকশাই চালাতে পারি না। যারা এই রিকশার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবার তাদেরকেই আমরা ভোট দেবো।

বিএনপির একাধিক প্রার্থী, সুযোগের অপেক্ষায় বাকি দলের প্রার্থীরা

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী শাহ মাসুদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিগত ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে আমি সরাসরি মাঠে ছিলাম। দল যখন যে কর্মসূচি দিয়েছে, আমি আমার সংগঠন ও নেতাকর্মীদের নিয়ে রাজপথে ছিলাম। আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে আমি জামালপুরের রাজনীতিতে সর্বোচ্চ মামলার আসামিদের একজন। তাই আমি শতভাগ আশাবাদী যে দল আমার ত্যাগ ও ভূমিকার মূল্যায়ন করবে। পৌরসভার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পানি নিষ্কাশন। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় এবং জনগণ নির্বাচিত করে, তাহলে এই সমস্যার সমাধানকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।

বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তির বিষয়ে মাসুদ বলেন, বিএনপির মধ্যে এখন কোনো কোন্দল নেই। এটি দেশের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। এখানে একাধিক প্রার্থী থাকাটা স্বাভাবিক এবং এটাকে আমি প্রতিযোগিতা হিসেবেই দেখি। অতীতে কিছু মতপার্থক্য থাকলেও এখন সবাই দলকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করছে।

মনোনয়ন ও নির্বাচনি সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, শহর বিএনপি, ওয়ার্ড বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে রয়েছেন। পাশাপাশি একজন প্রার্থীর নিজের গ্রহণযোগ্যতা ও ভোটব্যাংকও গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর রহমতে সেই অবস্থান আমার রয়েছে। তাই দল মনোনয়ন দিলে আমি বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।

বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী ও জেলা যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, জামালপুর পৌরসভার উন্নয়ন, নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন এবং একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত শহর গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই আমি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের পাশে আছি। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সবসময় জনগণের সুখ-দুঃখে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার চেষ্টা করেছি। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে জনগণের প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করব।

তিনি বলেন, পৌরসভার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ সংকট, যানজট, পরিচ্ছন্নতা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি। নির্বাচিত হলে এসব সমস্যা সমাধানে বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।

বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছে অন্যান্য দল। ইতোমধ্যে সাংগঠনিকভাবে মাঠে সক্রিয় হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির মেয়র প্রার্থী হিসেবে অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমানের নাম রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় রয়েছে।

তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে নির্বাচনকে আমরা শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাব হিসেবে দেখছি না। জনগণের আস্থা অর্জন করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী গণ মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তন হয়েছে। তারা এখন নেতা নির্বাচনের চেয়ে সৎ, দক্ষ ও যোগ্য সেবককে মেয়র হিসেবে পছন্দ করে। একারণে আমি আশাবাদী। বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বা তাদের কোনো দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা আমাদের নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি, প্রার্থীর গ্রহনযোগ্যতা এবং জনগণের কাছে আমাদের কর্মসূচি ও অঙ্গীকার তুলে ধরেই ভোট চাইব। জনগণ যদি আমাদের যোগ্য মনে করে, তাহলে ইনশাআল্লাহ তারা আমাদের পক্ষেই রায় দেবেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকেও প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আবিদ সৌরভকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এনসিপির মেয়র প্রার্থী আবিদ সৌরভ এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি এনসিপি থেকে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। জামালপুরকে আধুনিক ও তরুণবান্ধব পৌরসভা হিসেবে গড়ে তুলতে ৩৬ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছি। এর মধ্যে পৌরসভার বিভিন্ন নাগরিক সেবা অনলাইনে আনার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। তরুণদের নিয়েই আমি কাজ করতে চাই। আমার বিশ্বাস, তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষ যদি প্রার্থীদের কাজ ও পরিকল্পনা বিবেচনা করেন, তাহলে আমি ভালো অবস্থানে থাকব।

জোটের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনে এককভাবে নাকি জোটগতভাবে অংশ নেওয়া হবে, সেটি দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। দল যে সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা সেভাবেই এগোব।

অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও এবার জামালপুর পৌরসভা নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা যায়। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও কয়েকজন পরিচিত মুখের নাম নগরীর রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরছে। তবে তপশিল ঘোষণার পরই প্রার্থিতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জামালপুর জেলা নির্বাচন অফিসার মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, এখনো স্থানীয় কোনো নির্বাচনে তপশিল ঘোষণা হয়নি। যেটুকু বলতে পারি আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হবে। পরে পৌরসভাসহ বাদ বাকি নির্বাচনগুলো। তাই পৌর নির্বাচনের তপশিলের পর এটির কার্যক্রম শুরু হবে।