Advertisement

পৌরসভার বর্জ্যে নষ্ট লেমুঝিড়ির ১০ একর ফসলি জমি

মো. জামাল উদ্দীন, বান্দরবান
পৌরসভার বর্জ্যে নষ্ট লেমুঝিড়ির ১০ একর ফসলি জমি
বান্দরবানে পাহাড়ি ঢল ও বর্ষার পানিতে কৃষি জমিতে ছড়িয়ে পড়া পৌরসভার বর্জ্য। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বান্দরবান সদর উপজেলার লেমুঝিড়ি আগা ঘোনা পাড়ায় পাহাড়ি ঢল ও বর্ষার পানিতে পৌরসভার বর্জ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এতে প্রায় ১০ একরের (১৫ কানি) তিন ফসলি কৃষিজমি সম্পূর্ণ চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর ফলে স্থানীয় কৃষকদের জীবিকা নির্বাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন তারা। একই সঙ্গে দূষিত হচ্ছে প্রাকৃতিক ঝিড়ির পানি এবং বিপর্যস্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের পাশে পৌরসভার ফেলা বর্জ্য বর্ষার পানিতে ধুয়ে নিচে ধানক্ষেতে ছড়িয়ে পড়ছে। জমিতে প্লাস্টিক, পলিথিন, চিকিৎসাবর্জ্য (ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, সুচ, স্যালাইনের ব্যাগ) ও ভাঙা কাচ জমে থাকায় জমিতে কাজ করাই এখন জীবনঘাতী হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, বর্জ্যের কারণে ঠিকমতো চাষাবাদ করাই সম্ভব হচ্ছে না। এতে প্রতি বছর তাদের লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। জমি অনাবাদি হয়ে পড়ায় তাদের সংসার চালানো ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

একসময় স্থানীয়দের দৈনন্দিন কাজের প্রধান ভরসা ছিল লেমুঝিড়ির স্বচ্ছ পানি। বর্তমানে মেডিকেল বর্জ্য ও প্লাস্টিকের কারণে ঝিড়ির পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। পানির ব্যবহারে চর্মরোগ ও শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ায় গৃহস্থালি কাজে এই পানি ব্যবহার আপাতত বন্ধ রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য জমে থাকায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এতে মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশু ও জীব বৈচিত্র্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সংকট ছড়িয়ে পড়েছে ‘লেমুঝিড়ি আপন নগর জ্ঞানদর্শন-বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র’ নামে স্থানীয় বৌদ্ধবিহারেও। বর্জ্যের তীব্র দুর্গন্ধ ও দূষণের কারণে বিহারে ধ্যান ও প্রার্থনা করা দুষ্কর হয়ে উঠেছে বলে জানান বিহারের অধ্যক্ষ জ্ঞানদ্বীপ ভিক্ষু। ময়লার দুর্গন্ধে বিহারে অবস্থান করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে বলেও জানান তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অতিভারী বৃষ্টির সময় পৌরসভার অস্থায়ী বর্জ্য স্তূপ থেকে এক্সকাভেটর দিয়ে ময়লা ঝিড়ির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। পরে বৃষ্টির পানি ও পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে সেই বর্জ্য ঝিড়ি বেয়ে নিচের কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পৌরসভার বর্জ্য অপসারণ কর্মকর্তা দিদারুল হক চৌধুরী। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পৌরসভার সীমানার বাইরে হওয়ায় সেখানে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণের দায় জেলা প্রশাসনের বলে দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে বান্দরবান পৌর প্রশাসক এসএম মঞ্জুরুল হক এশিয়া পোস্টকে জানান, খবর পেয়েই ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জমিতে থাকা বর্জ্য কীভাবে দ্রুত অপসারণ করে আবার চাষাবাদের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বর্জ্য দূষণের এই সংকট আরও বিস্তৃত হবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ফলে, দীর্ঘমেয়াদে অনাবাদি হয়ে যেতে পারে আরও কৃষিজমি, দূষিত হতে পারে পানির উৎস এবং ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য।

লেমুঝিড়ির এই সংকট কেবল কৃষির ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও বড়ো হুমকি। স্থায়ী সমাধানের জন্য অনতিবিলম্বে উন্মুক্ত স্থানে মেডিকেল বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত ক্ষতিপূরণের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।