নিরাপত্তার আশ্বাস বন বিভাগের, তবুও শঙ্কা কাটছে না বনজীবীদের

দীর্ঘ বিরতির পর আবার শুরু হয়েছে সুন্দরবনে মধু আহরণ মৌসুম। জীবনের ঝুঁকি আর নানা আতঙ্ক উপেক্ষা করে মৌয়ালরা ছুটছেন গহিন বনে। তবে বাঘ-কুমিরের চিরচেনা ভয় ছাড়াও এবার নতুন করে যোগ হয়েছে বনদস্যু আতঙ্ক।
সকালে সুন্দরবনের সরু নদী ঢাংমাড়ি পেরিয়ে ছোট ডিঙি নৌকায় করে মৌয়ালদের বনে প্রবেশ করতে দেখা যায়। নির্দিষ্ট স্থানে নৌকা ভিড়িয়ে তারা পায়ে হেঁটে পৌঁছে যান গভীর অরণ্যে। কিছুদূর যেতেই চোখে পড়ে গাছের ডালে ঝুলে থাকা মৌচাক আর ভনভন করা মৌমাছির দল।
মৌয়ালরা শুকনো ও সবুজ পাতা দিয়ে তৈরি নোড়া জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি করেন। এরপর দ্রুত গাছে উঠে মৌচাকে ধোঁয়া দিয়ে মধুসহ চাক কেটে বালতিতে সংগ্রহ করেন। দীর্ঘ সময়ের ঝুঁকিপূর্ণ পরিশ্রম শেষে মধু হাতে পেয়ে স্বস্তি মেলে তাদের।
তবে এই দৃশ্যের আড়ালে রয়েছে ভয় আর অনিশ্চয়তা। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কুমির, সাপ ও বন্য শুকরসহ বিভিন্ন হিংস্র প্রাণীর আক্রমণের শঙ্কা প্রতিনিয়ত তাড়া করে মৌয়ালদের। যে কোনো সময় প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে।
এর সঙ্গে চলতি মৌসুমে নতুন করে দেখা দিয়েছে বনদস্যু আতঙ্ক। অনেক মৌয়াল জানান, ডাকাতদের ভয়ে অনেকে এবার বনে যেতে চান না। তবুও জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়েই মধু আহরণে যাচ্ছেন তারা।
মৌয়াল মো. রহিম শেখ (৪৫) বলেন, প্রতি বছরই ঝুঁকি থাকে, কিন্তু এবার ডাকাতের ভয় বেশি। বনে ঢোকার পর কখন কী হয় বলা যায় না।
আরেক মৌয়াল হাবিবুর রহমান (৩৮) বলেন, বাঘের ভয় তো আছেই, এখন মানুষের ভয়ও যোগ হয়েছে। তবুও না গেলে পরিবার চালানো কঠিন।
মৌয়াল আবদুল্লাহ বলেন, বন বিভাগ নিরাপত্তার কথা বললেও আমরা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারছি না। নদী ও বনের ভেতরে পাহারা আরও বাড়ানো দরকার।
বন বিভাগ জানিয়েছে, মধু আহরণে যাওয়া মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সুপেয় পানি ও খাদ্য সরবরাহসহ নানা সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
ঢাংমারি স্টেশনের কর্মকর্তা সুরজিৎ চৌধুরী বলেন, মৌয়ালদের নিরাপদে মধু আহরণ নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বনে হরিণের ফাঁদ বা যেকোনো বন অপরাধ দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে বন বিভাগকে জানাতে মৌয়ালদের অনুরোধ করা হয়েছে। তথ্য দিলে পুরস্কারের ব্যবস্থাও রয়েছে।
১ এপ্রিল শুরু হওয়া এই মৌসুম চলবে ৩১ মে পর্যন্ত। চলতি মৌসুমে ৭০০ কুইন্টাল মধু, ২০০ কুইন্টাল মোম এবং প্রায় ১৬ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর ৬৪৭ কুইন্টাল মধু ও ১৯৪ কুইন্টাল মোম আহরণ হয়েছিল, যার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় হয় ১৬ লাখ ৬২ হাজার ২২০ টাকা।