যাত্রী কম বলে চার্টারে যাচ্ছে এসটি নিঝুম দ্বীপ, সন্দ্বীপে আসছে ছোট সি-ট্রাক

সন্দ্বীপ-চট্টগ্রাম দুর্গম নৌপথে নিরাপদ যাত্রী পারাপারের জন্য আনা নৌযান ‘এসটি নিঝুম দ্বীপ’ চালুর মাত্র এক মাস না যেতেই সরিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। যাত্রী ও রাজস্ব আয় কমের যুক্তি দেখিয়ে ৩৩৩ জন ধারণক্ষমতার এই বড় সি-ট্রাকটি পর্যটন মৌসুমে ভাড়ায় (চার্টারে) দিচ্ছে সংস্থাটি। অথচ বিআইডব্লিউটিসির নিজস্ব হিসাবেই মাত্র ২৫ দিনে নৌযানটিতে ১২ হাজার ৩৪৮ জন যাত্রী যাতায়াত করেছেন। বড় নৌযানটি সরিয়ে তার জায়গায় আনা হচ্ছে মাত্র ২০০ যাত্রী ধারণক্ষমতার ছোট সি-ট্রাক ‘এসটি খিজির-৫’।
বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান বলেন, এসটি নিঝুম দ্বীপে যাত্রী কম, তাই আয়ও কম। চার্টারে দিলে বেশি রাজস্ব পাওয়া যাবে। তার ভাষ্য, ১৫ অক্টোবর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত সাগর শান্ত থাকে। এ সময় নৌযানটি চার্টারে দেওয়া হবে। পরে আবার সন্দ্বীপের পথে ফিরিয়ে আনা হবে। যাত্রীসেবা বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগ এলে মার্চের আগেই এটি ফিরিয়ে আনা হবে।
তবে বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তা যে সময়কে শান্ত বলছেন, সেই সময়ের মধ্যেই পাঁচ দিন নৌযানটির চলাচল বন্ধ ছিল। এর মধ্যে ১৯, ২০ ও ২১ অক্টোবর নাব্যতা সংকট এবং ২৭ ও ২৮ অক্টোবর আবহাওয়ার সতর্কতার কারণে চলাচল বন্ধ ছিল।
২৫ দিনের পারাপারের চিত্র
গত ১ অক্টোবর সন্দ্বীপের ঘাটে পৌঁছায় এসটি নিঝুম দ্বীপ। ২ অক্টোবর থেকে এটি যাত্রী পারাপার শুরু করে। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত অর্থাৎ ৩০ দিনের মধ্যে পাঁচ দিন নৌযানটির চলাচল বন্ধ ছিল। এর মধ্যে তিন দিন (১৯-২১ অক্টোবর) নাব্যসংকট এবং দুদিন (২৭ ও ২৮ অক্টোবর) আবহাওয়ার সতর্কতার কারণে চলাচল বন্ধ ছিল। ফলে নৌযানটি চলেছে ২৫ দিন।
বিআইডব্লিউটিসির হিসাবে, এই ২৫ দিনে সন্দ্বীপের ঘাট থেকে ৮ হাজার ৭৯৭ জন এবং বাঁশবাড়িয়া ঘাট থেকে ৩ হাজার ৫৫১ জন যাত্রী পারাপার হয়েছেন। দুই ঘাট মিলিয়ে মোট যাত্রী পারাপার হয়েছেন ১২ হাজার ৩৪৮ জন। আপ-ডাউন, অর্থাৎ দুই ট্রিপ মিলিয়ে চলাচলের দিনগুলোতে গড়ে প্রায় ৪৯৪ জন যাত্রী পারাপার হয়েছেন। এটি যাতায়াতের সংখ্যা। একই ব্যক্তি একাধিকবার যাতায়াত করলে তা আলাদাভাবে গণনা করা হয়নি।
৩১ অক্টোবর শুধু সন্দ্বীপের ঘাট থেকেই ৫০৮ জন যাত্রী পারাপার হয়েছেন। এসটি নিঝুম দ্বীপের যাত্রী ধারণক্ষমতা ৩৩৩ জন বলে জানিয়েছেন আশিকুজ্জামান।
এদিকে সম্প্রতি সন্দ্বীপ উপজেলা কমপ্লেক্স এলাকায় এক প্রতিবাদ সমাবেশে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলমগীর বলেন, স্পিডবোটের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে যাত্রী কম বলা হচ্ছে। সন্দ্বীপের যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন আমরা সন্দ্বীপবাসীর সমন্বয়ক খাদেমুল ইসলাম বলেন, ১২ হাজারের বেশি যাত্রী পারাপার হওয়াকে কম বলা যায় না। সরকারি নৌযান সাধারণ মানুষের জন্য। সবাই বেশি ভাড়ার স্পিডবোটে যাতায়াত করতে পারেন না।
সন্দ্বীপ অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রামের সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেনও সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করেন। তার মতে, চার লাখ মানুষের দুর্গম সমুদ্রপথের যাতায়াত নিরাপদ করার চেয়ে বেশি রাজস্ব আয়ের জন্য নৌযান চার্টারে দেওয়া অন্যায্য। তিনি জানান, এর আগে নিঝুম দ্বীপ একবার সরিয়ে নেওয়ার পর অক্টোবরে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তাই মার্চে ফিরিয়ে আনার আশ্বাসে তারা আস্থা রাখতে পারছেন না।
নাব্যসংকট, খননের সময়সীমা অনিশ্চিত
নিঝুম দ্বীপ নৌযানটির মাস্টার মো. একরামুজ্জামান জানান, ১৯ অক্টোবর সি-ট্রাকটি পন্টুনে ভিড়তে পারেনি। পরের দুই দিনের যাত্রাও বাতিল করা হয়। ফেরি কপোতাক্ষও পলি জমে কুমিরা ঘাটের কাছে কাদায় আটকে যায়। পরে প্রায় দুই ঘণ্টা পর যান্ত্রিক যানের সাহায্যে সেটি পন্টুনে ভিড়তে পারে।
বিআইডব্লিউটিএ কুমিরা ঘাটের সামনে খননকাজ শুরু করেছে ২৭ সেপ্টেম্বর। খনন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউর রশীদ খন্দকার জানান, ৪ হাজার ৫০০ ফুট দীর্ঘ পথে খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর প্রস্থ ১৩০ থেকে ১৪০ ফুট এবং গভীরতা প্রায় ২০ ফুট। দৈনিক প্রায় ১০ ঘণ্টায় ৬০ ফুটের মতো খনন করা হচ্ছে। কবে কাজ শেষ হবে বা কবে সি-ট্রাক ও ফেরি নির্বিঘ্নে চলতে পারবে, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। তার ভাষ্য, আরেকটি ড্রেজার যুক্ত হলে সময় অনেক কমে আসবে।
এদিকে খননের অগ্রগতি নিয়ে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা। ওমর ফয়সাল নামে একজন জানান, ১০ ঘণ্টা খননের কথা বলা হচ্ছে। যদি তাই হয়, তাহলে খননের কোনো অগ্রগতি নেই কেন?
বিআইডব্লিউটিসির একজন কর্মকর্তাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ১০ ঘণ্টা খননের দাবি সঠিক নাও হতে পারে। তার মতে, খননের কাজ বেসরকারি খাতে না দেওয়া পর্যন্ত এ রুটে নাব্যসংকট দূর হবে না।
এ বিষয়ে নির্বাহী কর্মকর্তা (ড্রেজিং) রেজাউর রশীদ খন্দকারের বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি ফোন ধরেননি।
ছোট নৌযানে সুবিধা বাড়বে কি না
আশিকুজ্জামানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসটি নিঝুম দ্বীপের যাত্রী ধারণক্ষমতা ৩৩৩ জন, আর এসটি খিজির-৫-এর ২০০ জন। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ কম। যাত্রীসংখ্যা এবং নাব্যতা ও আবহাওয়ার কারণে চলাচল বন্ধ থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে ছোট নৌযান আনায় যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা।
আশিকুজ্জামান বলেন, যাত্রীসেবা বা নিরাপত্তায় সমস্যা হলে নিঝুম দ্বীপ ফিরিয়ে আনা হবে। তার ভাষ্য, এসটি খিজির কম গভীরতায় চলাচলের উপযোগী। তাই সন্দ্বীপে পাঠালে নির্বিঘ্নে চলতে পারবে।
তবে এসটি খিজির-৫ নৌযানের তথ্য বলছে, এটি সমুদ্রে নয়, অভ্যন্তরীণ নৌপথ ও মোহনায় চলাচলের উপযোগী করে তৈরি।
এর আগে এ পথে চলত এমভি মালঞ্চ। সেটিও পর্যটন ব্যবসার কাজে চার্টারে দেওয়া হয়েছে। এমভি মালঞ্চের চার্টার চুক্তির মেয়াদ ও আর্থিক শর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
উপকূলীয় ফেরির অগ্রগতির তথ্য নেই
সন্দ্বীপের নৌপথে উপযুক্ত নৌযান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। সীতাকুণ্ড-সন্দ্বীপ নৌপথে ফেরি কপোতাক্ষ চালুর সময় থেকেই বলা হয়েছিল, এটি বছরব্যাপী চলাচলের উপযুক্ত নয়। তখন বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা সন্দ্বীপের ঘাট পরিদর্শন করে জানিয়েছিলেন, ঘাট সারা বছর সচল রাখতে উপকূলীয় ফেরি প্রয়োজন। নির্মাণাধীন একটি উপকূলীয় ফেরি অক্টোবরের মধ্যে যুক্ত হতে পারে বলেও তখন জানানো হয়।
পরে কপোতাক্ষের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের সময় আশিকুজ্জামান জানিয়েছিলেন, এ পথে দুটি সি-ট্রাক আনার প্রক্রিয়া চলছে। তা শেষ হতে জুন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। বিআইডব্লিউটিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ উপকূলীয় ফেরির পাশাপাশি আরও একটি ফেরি বরাদ্দের কথা বলেছিলেন। প্রয়োজনে থাইল্যান্ড বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশ থেকে উপকূলীয় ফেরি কেনার কথাও আলোচনায় এসেছিল। কিন্তু উপকূলীয় ফেরি বরাদ্দ বা দুটি সি-ট্রাক আনার উদ্যোগের অগ্রগতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিআইডব্লিউটিএর ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক নয়ন শীল বলেন, এ বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। ফলে যে কপোতাক্ষকে অনুপযুক্ত বলা হয়েছিল, সেটিই এখন এ পথে একমাত্র ফেরি।
আইনে কী আছে
বিআইডব্লিউটিসি আদেশ, ১৯৭২-এর ৫(২) ধারায় বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক বিবেচনায় কাজ করলেও করপোরেশনের পরিচালনা পর্ষদ সাধারণভাবে জনস্বার্থের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেবে। ১২(১) ধারায় উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ নৌপথে নিরাপদ ও দক্ষ নৌপরিবহন সেবা দেওয়াকে করপোরেশনের দায়িত্ব বলা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৭৬-এর ৫৪ ও ৫৪ক ধারায় যাত্রীবাহী নৌযানের রুট পারমিট এবং উপকূলীয় জলসীমায় চলাচলের জন্য লিখিত অনুমতির বিধান রয়েছে।