টুংটাং শব্দে মুখরিত কামারপট্টি, শেষ সময়ে বেড়েছে ব্যস্ততা

কোরবানি ঈদ ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন কিশোরগঞ্জের কামারেরা। সারাদিন টুংটাং শব্দে মুখর কামারপট্টি। বছরের অন্য সময়ের মন্দাভাব কাটাতে এখন দম ফেলারও ফুরসত নেই লোহা আর আগুনের সাথে লড়াই করা এই কারিগরদের। তারা জানান, রাত পোহালেই ঈদ, সেজন্য কাজের চাপ বেড়েছে। আজ বুধবার ভোর থেকেই কাজ শুরু করতে হয়েছে, চলবে গভীর রাত পর্যন্ত।
কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পুরান থানা, বড় বাজারসহ বিভিন্ন কামারপাড়া ঘুরে দেখা যায়, গত কয়েকদিন ধরেই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাপরের ফোঁস-ফাঁস আওয়াজ, জ্বলন্ত কয়লার তীব্র উত্তাপ আর হাতুড়ি পেটানোর চেনা টুংটাং শব্দে মুখর পুরো এলাকা। কুরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার প্রয়োজনীয় দা, বঁটি, ছুরি ও চাপাতি তৈরিতে ব্যস্ত শত শত কামার পরিবার। মৌসুমি এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সারা বছরের আয়ের স্বপ্ন বুনছেন তারা।
কারিগরেরা জানান, বছরের অন্য সময়ে দোকানে নামমাত্র কাজ থাকলেও কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে এখানে এক বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। এই বাড়তি চাহিদার জোগান দিতে কামারশালাগুলোতে কর্মসংস্থানের বিন্যাসও বদলে গেছে। আগে যেখানে একটি দোকানে মাত্র দুজন শ্রমিক কাজ করতেন, এখন সেখানে পাঁচ থেকে ছয়জন পর্যন্ত অতিরিক্ত কারিগর দিন-রাত সমানতালে কাজ করছেন।

শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজারগুলোতেও বসেছে অস্থায়ী ছুরির দোকান, যেখানে সাধারণ ক্রেতারা যেমন নতুন ধারালো সরঞ্জাম কিনছেন, তেমনি পুরোনো দা-ছুরি নতুন করে শান দিয়ে নিচ্ছেন।
এদিকে লোহা, কয়লা ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে এবার কোরবানির সরঞ্জামের বাজারে কিছুটা মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেখা গেছে, যা ক্রেতা-বিক্রেতাদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
বড় বাজার এলাকার কারিগর মোবারক হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পশুর চামড়া ছাড়ানোর ছোট ছুরি ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, দা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, বঁটি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, বড় ছুরি ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা এবং মাংস কাটার ভারী চাপাতি ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পুরোনো সরঞ্জাম শান দিতে গুনতে হচ্ছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা।

পুরান থানা এলাকার ক্রেতা আলাল হোসেন বলেন, পারিবারিকভাবে কোরবানির মাংস কাটার জন্য নতুন কিছু সরঞ্জাম কিনতে এবং পুরোনো দা-বঁটি শান দিতে এসেছি। তবে ঈদের মৌসুম হওয়ায় অন্য সময়ের চেয়ে দাম কিছুটা বেশি নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে মোরগ মহল এলাকার কারিগর খাইরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে কয়লা ও লোহার দাম অনেক বেশি। সেই অনুপাতে আমরা পণ্যের দাম বাড়াইনি, যার ফলে আমাদের লভ্যাংশ কমে যাচ্ছে।
কোরবানি ঘিরে সাময়িক এই উৎসবের আমেজের আড়ালে লুকিয়ে আছে এই লোকশিল্পের এক দীর্ঘমেয়াদি সংকট। আধুনিক যান্ত্রিক প্রযুক্তি এবং ফ্যাক্টরিতে তৈরি সস্তা স্টিলের পণ্যের আগ্রাসনের কারণে ঐতিহ্যবাহী কামার শিল্প এখন অস্তিত্বের সংকটে। তরুণ প্রজন্ম এই হাড়ভাঙা খাটুনির পেশায় আর আগ্রহ দেখাচ্ছে না, যার ফলে দক্ষ কারিগরের সংখ্যা দিন দিন কমছে।

সংস্কৃতি গবেষক ও স্থানীয় অংশীজনদের মতে, কামারপট্টির এই ব্যস্ততা কেবল ব্যবসার চিত্র নয়, এটি বাংলার শত বছরের গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ এবং কারিগরদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।