logo
Advertisement

ভোলা থেকে ঢাকায় পণ্য যাবে সরাসরি, কমবে সময়-খরচ

ভোলা থেকে ঢাকায় পণ্য যাবে সরাসরি, কমবে সময়-খরচ
ভোলা–ঢাকা (ইলিশা–কাঁচপুর) নৌপথে যোগাযোগের জন্য ঘাটে নোঙর করে রাখা ফেরি। ছবি : এশিয়া পোস্ট

দ্বীপ জেলা ভোলাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো ভোলা–ঢাকা নৌপথে সরাসরি ফেরি সার্ভিস চালু করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। ভোলার ইলিশা থেকে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে এ রুট। এতে এক ট্রিপে সময় লাগবে প্রায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা।

নতুন এই নৌ-যোগাযোগ চালুর ফলে ভোলার সঙ্গে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে ভোগান্তি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভোলায় উৎপাদিত কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য কম সময়ে রাজধানীর বাজারে আনা-নেওয়া করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। এতে সময় ও পরিবহন খরচও কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এত দিন ভোলা–লক্ষ্মীপুর নৌপথ ব্যবহার করে ভোলা থেকে রাজধানীতে পণ্যবাহী যানবাহন যেতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা সময় লাগত। শুষ্ক মৌসুমে নৌপথে নাব্যতা-সংকট এবং সড়কে যানজটের কারণে এ সময় আরও বেড়ে যেত। কখনো কখনো দুই থেকে তিন গুণ বেশি সময়ও লাগত। বছরের পর বছর এভাবেই ভোলা থেকে রাজধানীতে পণ্য পরিবহন করে আসছিলেন ব্যবসায়ী ও পরিবহনশ্রমিকেরা।

পণ্য পরিবহনের দুর্ভোগ কমাতে ভোলার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবার সরকারি উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ফেরি সার্ভিস চালু হলো। বিআইডব্লিউটিসির দুটি আধুনিক ফেরি দিয়ে ইলিশা–কাঁচপুর নৌপথে এ সেবা দেওয়া হচ্ছে। ফলে ভোলা–লক্ষ্মীপুর নৌপথের পরিবর্তে সরাসরি ইলিশা–কাঁচপুর রুটে পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করতে পারবে। এতে রাজধানীতে যাতায়াতের সময় প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

গত মঙ্গলবার বিআইডব্লিউটিসি পরিচালিত এ ফেরি সার্ভিসের উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

নতুন ফেরি সার্ভিস চালুর ফলে ভোলার সঙ্গে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সহজ হবে বলে আশা করছেন এ রুট ব্যবহারকারী পরিবহনশ্রমিক ও মালিকেরা। এর মাধ্যমে ভোলায় উৎপাদিত পণ্য কম সময়ে রাজধানীতে আনা-নেওয়া করা যাবে। ফলে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে ভোগান্তি কমার পাশাপাশি সময় ও খরচও কমবে।

ভোলা থেকে রাজধানীতে পণ্য পরিবহনকারী পরিবহনশ্রমিক কামরুল ইসলাম বলেন, আগে ভোলা থেকে রাজধানীতে পণ্য নিয়ে যেতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা সময় লাগত। অনেক সময় কাঁচামাল পরিবহনে বেশি সময় লাগায় সেগুলো নষ্ট হয়ে যেত। এখন সরকারি ফেরি সার্ভিস চালু হওয়ায় যেকোনো পণ্য ভোলা থেকে সহজে রাজধানীর বাজারে দিনে দিনে পৌঁছে দেওয়া যাবে। এতে ব্যবসায়ীরা পণ্যের ভালো দাম পাবেন এবং তাদের দুর্ভোগও কমবে।

আরেক পরিবহনশ্রমিক লোকমান হাকিম বলেন, আগে ভোলা থেকে পণ্য নিয়ে সড়কপথে যেতে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা দিতে হতো। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যেত। এখন সহজে ও নির্বিঘ্নে পণ্য পৌঁছে দেওয়া যাবে। ফেরিঘাট কাঁচপুরে হওয়ায় সুবিধা আরও বেড়েছে। রাতে পণ্য নামানোর পর ঢাকার যানজটে পড়তে হবে না। কাঁচপুর থেকে সিলেট, ময়মনসিংহ ও গাজীপুরে যাতায়াতও সহজ হবে।

ট্রাকচালক মালেক বলেন, তিন বছর আগে ভোলা–ঢাকা রুটে বেসরকারিভাবে ‘কার্নিভাল ক্রুজ’ নামে দুটি ফেরি সার্ভিস চালু হয়েছিল। তাদের ভাড়া বেশি ছিল। নির্ধারিত গাড়ির পর অন্য গাড়ি নিতে চাইত না। ফলে পরিবহনশ্রমিকদের সমস্যায় পড়তে হতো। এখন সরকারি ফেরি সার্ভিস চালু হওয়ায় সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে। তবে ভাড়া আরও ১ থেকে ২ হাজার টাকা কমানো হলে ভালো হবে।

বিআইডব্লিউটিসির ভোলা ইলিশা ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মো. কাওছার আহাম্মেদ খান বলেন, নতুন ফেরি সার্ভিস চালুর ফলে ভোলার সঙ্গে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সহজ হবে বলে আশা করছে বিআইডব্লিউটিসি। এ ফেরি সার্ভিস কর্মসংস্থান এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ সম্প্রসারণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এ রুটে পরিবহনের সংখ্যা বাড়বে। বিশেষ করে তরমুজ ও ধানের মৌসুমে কোনো পরিবহনকে আটকে থাকতে হবে না।

বর্তমানে ২৩ টনের নিচের ট্রাকের ভাড়া ১১ হাজার টাকা এবং এর বেশি ওজনের ট্রাকের ভাড়া ১২ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিটি ফেরিতে ৭ থেকে ৮টি ছোট গাড়ির পাশাপাশি ১২ থেকে ১৪টি ট্রাক পরিবহন করা যাবে। প্রতিদিন দুপুর ১টার মধ্যে ইলিশা ঘাট থেকে কাঁচপুরের উদ্দেশ্যে ফেরি ছেড়ে যাবে। আর কাঁচপুর থেকে ভোলার উদ্দেশে ফেরি ছাড়বে ভোর ৩টায়।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ভোলা যেহেতু একটি বিচ্ছিন্ন জেলা, এই জেলার জন্য ফেরি সার্ভিস একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সড়কপথে বিচ্ছিন্ন এই জেলার যোগাযোগব্যবস্থার কিছুটা ঘাটতি এ ফেরি সার্ভিসের মাধ্যমে পূরণ হবে।

ভোলাবাসীর চাহিদার কথা বিবেচনা করেই ভোলা–ঢাকা নৌপথে এ ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

এর আগে ভোলার ইলিশা ও নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরের মধ্যে গত ২৭ আগস্ট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে সরাসরি ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়। এ রুটে ‘বেগম সুফিয়া কামাল’ ও ‘বেগম রোকেয়া’ নামের দুটি ফেরি চলাচল করছে। প্রতিদিন উভয় প্রান্ত থেকে একটি করে ফেরি গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এক ট্রিপে কাঁচপুর–ইলিশা রুটে সময় লাগে প্রায় ৭ ঘণ্টা।

কাঁচপুর–ইলিশা সরাসরি ফেরি যোগাযোগ চালুর ফলে ভোলার মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন বাড়লে বিআইডব্লিউটিসির রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে।

২০২৩ সালে ভোলা–ঢাকা নৌপথে বেসরকারিভাবে ফেরি সার্ভিস চালু হয়েছিল। তবে সীমিতসংখ্যক যানবাহন ফেরিতে চলাচল করায় দীর্ঘ সময় ধরে জায়গার জন্য অপেক্ষা করতে হতো পরিবহন মালিকদের। এর আগে ২০০৮ সালে ভোলা–লক্ষ্মীপুর নৌপথে প্রথম ফেরি সার্ভিস চালু হয়। বর্তমানে ভোলা থেকে প্রতিদিন লক্ষ্মীপুর ও ঢাকা রুটে দুই শতাধিক পরিবহন চলাচল করে।