logo

প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই সড়কে ধস, পৌরসভার তদারকির অভাব

প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই সড়কে ধস, পৌরসভার তদারকির অভাব

২৫ কোটি টাকার একটি সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল মানিকগঞ্জ শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের সৌন্দর্যবর্ধন, পাবলিক টয়লেট, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সড়ক নির্মাণ। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। দেড় কিলোমিটার গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বিভিন্ন অংশ দেবে গিয়ে এখন তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও কাজ শেষ হয়নি, বরং বাড়তি ব্যয় সত্ত্বেও কাজের মান নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। ফলে পুরো প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অসংগতি।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে সিআরডিপি-২ প্রকল্পের আওতায় শহরের খাল পুনর্খনন, সৌন্দর্যবর্ধন, আরসিসি পাইপ ড্রেনেজ, তিনটি সেতু ও একটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণসহ একটি সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৫ কোটি ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪ টাকা। কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় অ্যাপেক্স এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স কামরুল অ্যান্ড ব্রাদার্স (জেভি)। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পরবর্তী সময়ে প্রকল্প ব্যয় আরও প্রায় তিন কোটি টাকা বাড়ানো হলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি বা মান নিশ্চিত করা যায়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলা জজ কোর্টের সামনে থেকে মানিকগঞ্জ মডেল উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার এবং বাজার ব্রিজ থেকে সদর থানা (গঙ্গাধরপট্টি রোড) পর্যন্ত এক কিলোমিটার সড়ক নতুন করে ড্রেনেজ নির্মাণের পর ইউনি ব্লক দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নির্মাণের কয়েক মাসের মধ্যেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে দেবে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কোথাও বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও বৃষ্টির সময় পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

এ ছাড়া ড্রেনের আরসিসি ঢাকনা ও ম্যানহোলের কভার সড়কের তুলনায় উঁচু হয়ে থাকায় যান চলাচলে তৈরি হয়েছে বাড়তি ঝুঁকি। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, রিকশা ও অটোরিকশা চালকদের জন্য এই সড়ক এখন প্রায় বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু নিম্নমানের নির্মাণকাজেরই প্রমাণ নয়, বরং প্রকল্প পরিকল্পনা ও তদারকির ঘাটতিরও স্পষ্ট উদাহরণ।

পৌরসভার গঙ্গাধরপট্টি এলাকার বাসিন্দা কাজী হুমায়ূন কবীর লিটন বলেন, এত বড় একটি প্রকল্প শুরু হলেও এর বাস্তব চিত্র হতাশাজনক। গঙ্গাধরপট্টি সড়ক দিয়ে ভারী ট্রাক, লরি ও যানবাহন নিয়মিত চলাচল করে। এই সড়কে বিটুমিনাস কার্পেটিং ছিল আগে। এখন তারা ড্রেন নির্মাণের পর ইউনি ব্লক দিয়ে সড়ক সংস্কার করেছে। কাজের মান এতটাই খারাপ যে কয়েক মাসের মধ্যেই সড়ক দেবে গেছে। এটি স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে পৌরসভার প্রকৌশলীর তদারকির দুর্বলতার ফল। তাদেরকে জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।

 
মোটরসাইকেল চালক শাওন আহমেদ রাজু জানান, ‘এই দুই সড়কে মোটরসাইকেল চালাতে অনেক ঝামেলা হয়। রাস্তার চেয়ে উঁচু ড্রেন ও ম্যানহোলের ঢাকনা। যার কারণে একটু অমনোযোগী হলেই দুর্ঘটনা হবেই। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে। কোথাও গর্ত, কোথাও উঁচু-নিচু এভাবে গাড়ি চালানো খুবই কঠিন।’

 ট্রাকচালক সাদেক হোসেন বলেন, এই গঙ্গাধরপট্টি রোড সর্বোচ্চ ৬-৭ মাস হয়েছে। আমাদের লোড গাড়ি নিয়ে চলতে অনেক ভয় হয়। অনেক জায়গায় দেবে গেছে। একটু এদিক-সেদিক হলেই খালে উল্টে পড়ে যেতে হবে। আমরা চাই এটাকে কার্পেটিং করে দেওয়া হোক।

 শুধু চালকরাই নয়, পথচারীরাও পড়ছেন বিপদে। আদালত এলাকায় একটি গর্তে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। ফুল ব্যবসায়ী আলমগীর বলেন, ‘প্রথম থেকেই কাজের মান খারাপ ছিল। এখন তো অবস্থা আরও খারাপ। কোথাও গাড়ি কাত হয়ে যায়, কোথাও চলাচলই সম্ভব না।

সড়কের এই বেহাল অবস্থার কারণে শহরের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সমস্যা সাধারণত দুর্বল মাটি প্রস্তুত, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার এবং যথাযথ কম্প্যাকশন না করার ফলে হয়ে থাকে। একই সঙ্গে ড্রেন ও সড়কের উচ্চতার সমন্বয় না থাকাও একটি বড় ত্রুটি হিসেবে দেখা দেয়। এসব বিষয় প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় যথাযথভাবে নিশ্চিত না করা হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ পৌরসভার প্রকৌশলী শাহাদাৎ হোসেন বলেন, আমরা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি। ঠিকাদারকে কাজ শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত বিল দেওয়ার আগে পুরো সড়ক পুনরায় পরীক্ষা করে যেসব জায়গায় দেবে গেছে সেগুলো ঠিক করে নেওয়া হবে।