logo

বারিধারায় নিহত মেহেদীর মায়ের আর্তনাদ/‘ছাওয়ালটা কইল, এবার টাকা আনি ঘর ঠিক কোরিম’

‘ছাওয়ালটা কইল, এবার টাকা আনি ঘর ঠিক কোরিম’
গাড়িচাপার সিসিটিভি ফুটেজ, নিহত মেহেদী হাসান মিম ও তার মা মিনু বেগম। কোলাজ ছবি: এশিয়া পোস্ট

‘মোর ছাওয়ালটা কোইল, এবার টাকা আনি ঘরটা নতুন করি ঠিক কোরিম।’ অর্থাৎ আমার ছেলেটা বলেছিল, এবার টাকা এনে ঘরটা নতুন করে ঠিক করব। আর্তনাদ করে কথাগুলো বলছিলেন ঢাকার বারিধারায় গাড়িচাপায় প্রাণ হারানো মেহেদী হাসান মিমের মা।

দুই দিন আগে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের হাজীপাড়া গ্রাম ঢাকায় এসেছিলেন মেহেদী। বাড়ি ছাড়ার আগে মাকে বলেছিলেন, এবার ঢাকায় এসে কাজ করে যে আয় হবে বাড়িতে ঘর তুলবেন। সেই স্বপ্ন পূরণের আগে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বারিধারা কে-ব্লকের ১ নম্বর রোডে ১৩ নম্বর বাসার সামনে দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি।

বুধবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে মেহেদীর মরদেহ নিজ বাড়িতে পৌঁছায়। পরে বিকেল তিনটার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। মেহেদীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলেকে হারিয়ে শোকে কাতর মা মিনু বেগম। ছেলের কথা মনে করে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিনু বেগম বলেন, ‘গত পরশু মোর ছাওয়ালটা ঢাকাত গেইল। কয়েক দিন আগে যাবার চাইছিল। মুই কনু এলা গরম রোদ চলেছে, এলা যাবার লাগিবে না। রোদ, গরম কমিলে তোমরা যান। সেই তানে রোদ কমিল তারপর এলা গেইল। মোর ছাওয়ালটা কোইল, এবার টাকা আনি ঘরটা নতুন করি ঠিক কোরিম।’

পরিবার ও স্বজনদের ভাষ্য, দুর্ঘটনার দিন আসরের নামাজ শেষে ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মেহেদী। এ সময় একটি প্রাইভেটকার তাকে চাপা দেয়। ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়।

স্বজনরা আরও জানান, সোমবার রাতে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন মেহেদী। মঙ্গলবার ভোরে ঢাকায় পৌঁছান তিনি। সেখানে বিভিন্ন ছোটখাটো ব্যবসার পাশাপাশি রাজমিস্ত্রির কাজও করতেন। প্রতি মাসে নিজের উপার্জন থেকে বাবা-মাকে প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা দিতেন।

মেহেদীদের পরিবারে দুই ভাই ও এক বোন। বড় ভাই মুক্তাদির আলাদা থাকেন। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা-মাকে নিয়ে মেহেদীর সংসার চলছিল। পরিবারের কোনো আবাদি জমি নেই। বসতভিটা তাদের সম্বল।

মেহেদীর মামাতো ভাই সাজ্জাদ চৌধুরী জয় জানান, মেহেদী বাক্‌প্রতিবন্ধী ছিলেন। তিনি শুনতে ও কথা বলতে পারতেন না। ডোমার সরকারি কলেজের বিএ দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। বয়স হয়ে যাওয়ায় দিনমজুর বাবার পক্ষে আগের মতো কাজ করা সম্ভব হচ্ছিল না। পরিবারের আয়ের অন্যতম প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছিলেন মেহেদী।

জয় আরও বলেন, মেহেদী শুধু শ্রমিকের কাজই করতেন না, বিভিন্ন ধরনের শৈল্পিক কাজেও দক্ষ ছিলেন। কাগজ দিয়ে ফুলসহ নানা ধরনের জিনিস তৈরি করতে পারতেন। আর্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার আগ্রহ ও দক্ষতা ছিল।

মেহেদীকে গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যায়, কালো রঙের একটি প্রাইভেট কার দ্রুত গতিতে এসে ফুটপাতে বিশ্রামরত মেহেদী হাসানকে চাপা দেয়। পরে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে গাড়ির নিচ থেকে মেহেদীর রক্তাক্ত দেহ বের করে আনেন।

ফুটপাতে বসে থাকা মেহেদীকে চাপা দেওয়ার পর প্রাইভেট কারটি থেকে দুজন ব্যক্তি নেমে আসেন। গাড়ির ডান পাশ থেকে অর্থাৎ চালকের আসন থেকে নেমে আসে কালো টি–শার্ট পরা এক কিশোর। অপর পাশ থেকে শার্ট পরা মধ্যবয়সী এক ব্যক্তিকে নেমে আসতে দেখা যায়। আশপাশের লোকজন ছুটে এলে তারা দুজনই প্রাইভেট কারের পাশে যান। পরে ওই কিশোরকে সেখান থেকে এক দিকে সরে যেতে দেখা যায়।

এ ঘটনায় মেহেদীর বড় ভাই মোক্তাদির ইসলাম গুলশান থানায় মামলা করেছেন। গাড়িচাপা দেওয়া কিশোরকে রহস্যজনকভাবে মামলা থেকে বাদ দিয়ে আসামি করা হয়েছে পাশের সিটে বসে থাকা আকাশ মারককে।

মেহেদীকে চাপা দেওয়া গাড়ির ভেতর থেকে পাওয়া কাগজে দেখা যায়, ঢাকা মেট্রো গ ১৮৬৬৭৬ গাড়িটি নিবন্ধন করা মিসেস সিগমা আব্বাস নামে একজনের নামে। ওই গাড়ির রেজিস্ট্রেশনে মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে আব্বাস শরীফ নামে একজনের।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়িতে থাকা কিশোর আজান শরীফের বাবা আব্বাস শরীফ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একজন কর্মকর্তা। যদিও বিমানের সরকারি ওয়েবসাইটে ওই নামে কোনো কর্মকর্তার খোঁজ মেলেনি।

গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইসমাইল হোসেন খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, গাড়িচাপায় শ্রমিক নিহতের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। নিহত মেহেদীর ভাই মোক্তাদির বাদী হয়ে গাড়িতে থাকা আকাশ মারক নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। গাড়ির ভেতরে থাকায় আজান শরীফ নামে এক কিশোরকেও আমরা হেফাজতে নিয়েছি। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) তাকেও আদালতে সোপর্দ করা হবে।

গাড়ি চালক ওই কিশোরকে মামলার এজাহার থেকে বাদ দিয়ে কেন পাশের সিটে থাকা আকাশের বিরুদ্ধে মামলা করা হলো–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাদী মামলা করেছেন। আমরা তদন্ত করে দেখব কে আসলে দোষী।

এ বিষয়ে জানার জন্য মামলার বাদী মোক্তাদির ইসলামের ফোনে কল দিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এশিয়া পোস্টের প্রতিবেদক। তার ফোন নম্বরটি বন্ধ থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।