logo
Advertisement

ফেনী পৌরসভায় বেড়েছে হোল্ডিং ট্যাক্স, প্রত্যাহারের দাবি পৌরবাসীর

মিজানুর রহমান
ফেনী, চট্টগ্রাম
ফেনী পৌরসভায় বেড়েছে হোল্ডিং ট্যাক্স, প্রত্যাহারের দাবি পৌরবাসীর
ফেনী পৌরসভা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ফেনী পৌরসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকলেও নতুন করে হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন নির্ধারিত হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে পৌরবাসীর মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কারও কর বেড়েছে দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রায় ৩৫ গুণ পর্যন্ত। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখির পাশাপাশি সম্প্রতি পৌরসভার প্রধান ফটকের সামনে মানববন্ধন করেছেন পৌরবাসীরা। তারা নতুন নির্ধারিত কর প্রত্যাহার ও পুনর্মূল্যায়নের পাশাপাশি নাগরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে কর নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন।

ফেনী পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পৌরসভায় হোল্ডিং ট্যাক্স গ্রাহক রয়েছেন প্রায় ২৭ হাজার ৫০০ জন। গত অর্থবছরে হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ পৌরসভা প্রায় ৬ কোটি টাকা আদায় করেছে। চলতি অর্থবছরে নতুন নির্ধারিত করের ভিত্তিতে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ কোটি টাকা।

পৌরবাসীর অভিযোগ, নতুন করে কর নির্ধারণে ব্যাপক অসংগতি রয়েছে। তাদের দাবি, কারও কর ২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা, কারও ২০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা এবং কারও ২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

পৌর এলাকার রামপুরের বাসিন্দা সিরাজ উল্লাহ বলেন, গত বছর তার হোল্ডিং ট্যাক্স ছিল ২ হাজার ৫২ টাকা। এবার তাকে ৬৭ হাজার ৪৫০ টাকার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, তার ভবনটি দুইতলা এবং ভবনে কোনো পরিবর্তনও হয়নি। এরপরও কীভাবে এত বেশি কর নির্ধারণ করা হয়েছে, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।

সিরাজ উল্লাহ বলেন, সংসারের খরচ বেড়েছে, কিন্তু আয় বাড়েনি। গত বছর ২ হাজার ৫২ টাকা কর দিয়ে এবার ৬৭ হাজার ৭৫০ টাকা কেন দিতে হবে? নাগরিকদের সঙ্গে আলোচনা না করেই কর্মকর্তারা অস্বাভাবিক হারে হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করেছেন।

তিনি অবিলম্বে এসব অযৌক্তিক কর প্রত্যাহার করে পৌরবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে নতুন করে কর নির্ধারণের দাবি জানান। অন্যথায় বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

শরীফুল ইসলাম রাসেল নামে এক পৌরবাসীর অভিযোগ, সাবেক মেয়রের সময়ে করা জরিপের তথ্য ব্যবহার করে পৌরসভার কর্মকর্তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো কর নির্ধারণ করছেন। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে দেশের অন্য কোনো পৌরসভায় এভাবে হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানো হয়নি। পৌরসভার অস্থায়ী কর্মচারীদের অনেকের বাড়ি-গাড়ি রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

শরীফুল ইসলাম আরও বলেন, অনেক নাগরিক আয়কর রিটার্ন দাখিলের জন্য নিয়মিত পৌরকর পরিশোধ করেছেন। তাদের ওপর অস্বাভাবিক কর চাপানো হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মকর্তারা ঘুষ নেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বর্তমান কর্মকর্তাদের অপসারণ এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্বে না আসা পর্যন্ত নতুন নির্ধারিত হারে কর না দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

আবদুর রহিম নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, আগে তার হোল্ডিং ট্যাক্স ছিল ৮৩৯ টাকা। এবার তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৭২৫ টাকা। তিনি আগের নির্ধারিত কর পুনর্বহালের দাবি জানান। নতুন নির্ধারিত হারে কর দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি। তার মতে, আলোচনা করেই করের হার নির্ধারণ করা উচিত।

ওসমান গনি রাসেল নামে আরেক পৌরবাসী বলেন, পৌরসভার ড্রেনেজব্যবস্থা ঠিক নেই, সড়কের বাতিগুলোও ঠিকমতো কাজ করে না। ডেঙ্গু প্রতিরোধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এসব নাগরিক সেবা নিশ্চিত না করলে কর দিতে তারা বাধ্য নন।

ওসমান গনি বলেন, তারা একটা বিল করে দেবে, আমরা দিয়ে দেব—এমন তো হতে পারে না। আগে যেখানে ২ হাজার টাকা কর দেওয়া হতো, এবার সেখানে ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি অবিলম্বে এসব কর প্রত্যাহারের দাবি জানান। দাবি মানা না হলে পৌরসভা ঘেরাওসহ কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

পৌর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

এ বিষয়ে ফেনী পৌরসভার এসেসর মোহাম্মদ হানিফ বলেন, হোল্ডিং ট্যাক্স সাধারণত পাঁচ বছর পরপর নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ কর নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০১৭-১৮ সালে। নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি কর নির্ধারণের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালে। সরকার পরিবর্তন, বন্যাসহ বিভিন্ন কারণে এ কাজে বিলম্ব হয়েছে। পরে কাজ শেষ করে নাগরিকদের কাছে নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

মোহাম্মদ হানিফ বলেন, নাগরিকদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কর কমানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। কারও কর অস্বাভাবিক মনে হলে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। আবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবনের পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করেই নতুন কর নির্ধারণ করা হয়েছে।

কর বাড়ানো-কমানোর জন্য কর্মকর্তারা টাকা নিয়েছেন—এমন অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই বলে দাবি করেন মোহাম্মদ হানিফ। তিনি বলেন, কেউ তার বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারলে তিনি পদত্যাগ করবেন।

তিনি আরও বলেন, আগের সময়েও অনেকেই হোল্ডিং ট্যাক্স কমানোর জন্য পৌরসভায় এসেছেন। ২০১৮ সালে হাজি আলাউদ্দিন মেয়র থাকাকালে অনেকে দুই-তিনবার তদবির করেছেন এবং মেয়র ও সংসদ সদস্যের সুপারিশ নিয়ে এসেছেন। পুরোনো ভবনের তথ্য দেখিয়ে অনেকে কর দিয়েছেন। এ ধরনের ক্ষেত্রে কর কমানোর বিভিন্ন রেকর্ড পৌরসভায় রয়েছে। কারও কর ১৩০ শতাংশ, কারও ১০৮ শতাংশ এবং কারও ১২৯ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর রেকর্ড রয়েছে। নতুন করে পুনর্মূল্যায়নের পর এসব বিষয় নাগরিকদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে।

এ বিষয়ে ফেনী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, পৌরসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকা অবস্থায় কর্তৃপক্ষ একতরফাভাবে কীভাবে পৌরকর নির্ধারণ করল, তা তার বোধগম্য নয়। এ বিষয়ে সর্বস্তরের পৌরবাসীকে নিয়ে গণশুনানি করে কর নির্ধারণ করা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ফেনী পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সচিব) মোহাম্মদ সামছুদ্দিন বলেন, আড়াই বছর আগের যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে আট বছর পর হোল্ডিং ট্যাক্স পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কোনো গৃহমালিকের ট্যাক্স নিয়ে অভিযোগ থাকলে বিধি অনুযায়ী আপিল করার সুযোগ রয়েছে।

মোহাম্মদ সামছুদ্দিন বলেন, যারা আগে বেশি কমিয়েছেন, তাদের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। আমরা কারও প্রতি অন্যায় করছি না। তাছাড়া প্রতি বুধবার ব্যক্তিগত পর্যায়ে শুনানি করা হচ্ছে।