logo

কারাম উৎসবে ঐতিহ্যের রঙে রাঙল পত্নীতলা

কারাম উৎসবে ঐতিহ্যের রঙে রাঙল পত্নীতলা
নওগাঁর পত্নীতলায় অত্যন্ত সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়েছে সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী ‘কারাম উৎসব’। ছবি: এশিয়া পোস্ট

মাদল, ঢাক ও করতালের তালে তালে নাচ-গান, পূজা-অর্চনা আর লোকগাথায় মুখর নওগাঁর পত্নীতলা। প্রকৃতি ও কৃষির সমৃদ্ধি কামনায় উপবাস, ধর্মীয় আচার ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী ‘কারাম উৎসব’। নিজেদের ইতিহাস, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই আয়োজন করা হয় এ উৎসবের।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর হাইস্কুল মাঠে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পত্নীতলা উপজেলা শাখার উদ্যোগে বর্ণাঢ্য আদিবাসী সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পত্নীতলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী মহাদেবপুর, নিয়ামতপুর, পোরশা ও ধামইরহাট উপজেলা থেকে আসা ৫০টির বেশি সাংস্কৃতিক দল অংশ নেয়। নিজস্ব পোশাকে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ও সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ।

এর আগে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বুজরুক মামুদপুর গ্রামে শুরু হয় উৎসবের মূল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। দিনভর উপবাস পালনের পর সন্ধ্যায় একদল কিশোরী নিয়ম মেনে কারাম গাছের ডাল কেটে এনে পূজার বেদিতে স্থাপন করেন। এরপর দিয়াবাতি, জাওয়া ডালি ও বিভিন্ন ধরনের ফলমূল উৎসর্গের মধ্য দিয়ে শুরু হয় কারাম পূজা।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পূজাস্থলে জড়ো হন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। পুরোহিত কিচ্ছার মাধ্যমে ‘কার্মা ও ধার্মা’—দুই ভাইয়ের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় কাহিনি তুলে ধরেন। ধর্মীয় আলোচনা ও গল্প বলা শেষে নারীরা পরস্পরের আমন্ত্রণে নৈশভোজের মাধ্যমে উপবাস ভঙ্গ করেন। এরপর কারাম ডালকে ঘিরে ঢাক, মাদল ও করতালের তালে রাতভর চলে ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান।

বুধবার বিকেলে ধর্মীয় রীতি মেনে গীত গাইতে গাইতে কারাম ডাল নিয়ে নজিপুর হাইস্কুল মাঠে আসেন পূণ্যার্থীরা। সেখানে ডালটি পুনঃস্থাপনের পর বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা সাংস্কৃতিক দলগুলোর নৃত্য পরিবেশনা ও প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। পরে ধর্মীয় আচার শেষে সন্ধ্যায় আত্রাই নদীতে কারাম ডাল বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এবারের উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে কারাম মূলত ফসলকেন্দ্রিক একটি উৎসব। প্রতিবছর ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষে এ উৎসব পালিত হয়, যা স্থানীয়ভাবে ‘ডালপূজা’ নামেও পরিচিত। প্রকৃতি ও কারাম বৃক্ষের সঙ্গে কৃষির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে বলে তাদের বিশ্বাস। ভূমির উর্বরতা বৃদ্ধি, ভালো ফলন এবং পরিবারের সুখ-শান্তির প্রার্থনাই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

আয়োজনে উপস্থিত স্থানীয় নারী প্রতিনিধি বিসরি এক্কা, সোহাগী টপ্প্যা ও সবিতা কুজুর বলেন, অর্থসংকটের কারণে আগের মতো প্রতিবছর বড় পরিসরে উৎসব আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পেলে এ ঐতিহ্যবাহী আয়োজন নিয়মিতভাবে ধরে রাখা সম্ভব হবে।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পত্নীতলা শাখার সভাপতি সুবোধ ওঁরাও বলেন, কারাম ডাল আমাদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক ঐক্যের বার্তা দেয়। প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আধুনিক যুগেও এ ধরনের ঐতিহ্য রক্ষা করা জরুরি।

পত্নীতলা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক যোগেন্দ্র নাথ সরকার বলেন, কারাম পূজা সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর একটি প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

উৎসবের মিলনমেলায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য সামসুজ্জোহা খান জোহা, পত্নীতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা, চলচ্চিত্র শিল্পী ড্যানি সিডাক, ইনফরমাল সেক্টর ইন্ডাস্ট্রি স্কিল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মির্জা নুরুল গণি শোভন, অ্যাসেড ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মুরাদ এবং উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ফারুক। এ ছাড়া স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।