logo

মুগ্ধতায় লুকানো বেদনার ছায়া

মুগ্ধতায় লুকানো বেদনার ছায়া

চা মানে তৃপ্তির ঢেকুর। চা ছাড়া জমে না আড্ডা। কারও তো ঘুমই ভাঙে চায়ের গন্ধে। এর জোগান আসে যেখান থেকে—চা বাগান মানে বিস্তীর্ণ সবুজ। যা দেখে মুগ্ধ হয় সবাই। তৃপ্তি অথবা মুগ্ধতা; যাদের ত্যাগে এমন সৌন্দর্যের রচনা হয়, তারা অধিকাংশ নারী। তাদের জীবনে আছে এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। 

দেশে চা শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকের অর্ধেকের বেশি নারী। চা পাতা বা কুঁড়ি তোলার প্রধান কাজটিই করেন নারীরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নারীরা এই কাজে শ্রম দিচ্ছেন। অনেক সুযোগ-সুবিধা এখনও তাদের নাগালে আসেনি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবাসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে। মজুরিও পান প্রয়োজনের তুলনায় কম।

নারী শ্রমিকদের জীবনধারা মানে সোমবার থেকে শনিবার সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করা। কেউ সকাল খেয়ে বের হন। সময় না থাকলে বাটিতে খাবার নিয়েই ছুটতে হয়। দুপুরে খাবার বলতে পাতিচখা বা পাতি চাটনি; যা বানানো হয় চাল ভাজা, চায়ের কুঁড়ি পাতা, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ ইত্যাদি দিয়ে। বসতিতে ফিরতে-ফিরতে সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত আটটা বেজে যায়। ঘরে ফিরে সংসারের কাজ করতে হয়।

জীবনধারা নিয়ে চাপা আর্তনাদ
আজ ৮ মার্চ (রোববার), আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিনে নিজেদের জীবনধারা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নারী চা শ্রমিকরা। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আলীনগর ও মাধবপুর চা বাগানের নারী শ্রমিকরা এশিয়া পোস্টকে জানান, ২৫-৩০ কেজি চা পাতা তুলে মজুরি পান ১৭৮ টাকা। বাড়তি চা পাতা তুললে যে পরিমাণ টাকা পাওয়ার কথা, তা-ও পান না বেশির ভাগ সময়। কর্মস্থলে নেই তাদের জন্য শৌচাগার।

তারা আরও জানান, নারী দিবসে তাদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তারা ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার চান।

কমলগঞ্জের শমশেরনগর দেওছড়া চা বাগানের নারী শ্রমিক গীতা রবিদাস বলেন, প্রতি বছর নারী দিবসের কথা শুনি। এই দিবসে কী হয় আমরা জানি না। এই দিনে তো আমাদের ছুটিও নেই। কোনো সাহায্য-সহায়তাও পাই না। অনেক দিবস এলেও আমাদের জীবনের বঞ্চনা ও কঠোর পরিশ্রমের গল্প তো আর শেষ হয় না।

বেতন কম হওয়ায় অনেকে এই পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন জানিয়ে কানিহাটি চা বাগানের রুকমনিয়া মৃধা বলেন, দারিদ্র্যতার কারণে সন্তানদেরও পড়াশোনা ছেড়ে একই পেশায় আসতে হয়। আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।

যা বলছেন চা-শ্রমিক নেতারা
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক উপদেষ্টা রামভজন কৈরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, চা বাগানে অর্ধেক নারী শ্রমিক হলেও নারী হিসেবে কর্মস্থলে যে সুযোগ-সুবিধা থাকার দরকার, তা তারা পাচ্ছেন না। কর্মক্ষেত্রে শৌচাগার নেই, কিন্তু চুক্তিতে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নারী চা শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য ডে কেয়ার নেই। 

তিনি জানান, প্রতিটি চা বাগানে নারী শ্রমিকদের সুখ-দুঃখ, ব্যক্তিগত বিষয়ে আলাপের জন্য একজন নারী কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন। একইসঙ্গে সামাজিক ও ট্রেড ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডেও নারী চা শ্রমিকদের কার্যকর অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন।

মৌলিক সুবিধার দাবিতে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা বলেন, শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিয়ে মালিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হলেও অনেক সমস্যার সমাধান এখনও হয়নি। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য কর্মক্ষেত্রে শৌচাগার ও প্রক্ষালন কক্ষের অভাব একটি বড় সমস্যা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট অঞ্চলীয় সভাপতি জিএম শিবলী বলেন, চা বাগানের অনেকগুলোই বর্তমানে বন্ধের পথে, অনেকে শ্রমিকের মজুরি দিতে পারছেন না। কারণ, চায়ের ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না।