logo

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে ভোলার লক্ষাধিক জেলে

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে ভোলার লক্ষাধিক জেলে
ভোলার নদীতে মাছ ধরার প্রস্তুতিতে জেলেরা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায় নতুন করে বিপাকে পড়েছেন উপকূলীয় জেলা ভোলার কয়েক লাখ জেলে। নদী ও সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে জ্বালানি খরচ বাড়লেও বাড়েনি মাছের দাম কিংবা জেলেদের আয়। ফলে জলযানের পেছনে প্রতিদিনই খরচ বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় মিলছে না কাঙ্ক্ষিত আয়।

ইলিশসহ বিভিন্ন মাছের আশায় নদীতে নেমে বাড়তি জ্বালানি খরচ গুনতে হচ্ছে জেলেদের। মাছ কম পাওয়ায় অনেক সময় নৌকা ও ট্রলারের খরচই উঠছে না; ফলে লাভের বদলে গুনতে হচ্ছে লোকসান। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় নদীতে গিয়ে অনেকে এখন আরও বেশি ঋণ ও ধারদেনে জড়িয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে এনজিওর কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়তে হচ্ছে তাদের।

ভোলার মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদী ও উপকূলীয় জলসীমায় বছরজুড়েই ইলিশের সংকট ছিল। কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় এমনিতেই লোকসানে রয়েছেন জেলে ও ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে হঠাৎ জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় নদী ও সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা নতুন করে চাপের মুখে পড়েছেন।

জেলেরা জানান, একটি মাছ ধরার ট্রলার সাগরে প্রতিটি ট্রিপে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার জ্বালানি তেল ব্যবহার করে। ফলে লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ায় প্রতি ট্রিপেই জ্বালানি খাতে বাড়তি বড় অঙ্কের টাকা গুনতে হবে। এতে মাছ আহরণে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি লোকসানের আশঙ্কাও বাড়ছে।

নতুন সমন্বিত দর অনুযায়ী আগের তুলনায় লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়ে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

জেলে ইউসুফ মাঝি জানান, ইলিশের মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় তারা আগে থেকেই লোকসানে রয়েছেন। তার ওপর তেলের দাম বাড়ায় খরচ আরও বেড়ে যাবে। ফলে অনেক জেলেই সমুদ্রে বা নদীতে ট্রলার পাঠানো নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

শুধু মাছ আহরণই নয়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে মাছ পরিবহন, বরফ উৎপাদন ও সংরক্ষণসহ পুরো মৎস্য সরবরাহ ব্যবস্থায়। এতে শেষ পর্যন্ত বাজারে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের দামও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মৎস্য ব্যবসায়ীরা।

ইলিশার মৎস্যজীবী আকরাম জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম বহন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে আয় হ্রাস, অন্যদিকে ট্রলার পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি—এই দুইয়ের চাপে অনেক জেলে মাছ ধরায় নিরুৎসাহিত হয়ে পড়তে পারেন। তাই জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনা অথবা জেলেদের জন্য বিশেষ ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন।

আরেক জেলে সিরাজুল ইসলাম বলেন, চলতি বছর নদীতে এমনিতেই মাছ কম পাওয়া যাচ্ছে। তার ওপর তেলের দাম বৃদ্ধি আমাদের মতো জেলেদের জন্য অনেক কষ্টের কারণ হবে। তেলের দাম বাড়ায় নদীতে ট্রিপ কমে যাবে, আর এনজিওর কিস্তি ও দাদনের বোঝা আরও বাড়বে। ঋণের এই টাকা কীভাবে শোধ করব—সেই দুশ্চিন্তাতেই দিন কাটছে সবার।

ভোলার মৎস্য-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের মোট ইলিশের চাহিদার প্রায় ৩৪ শতাংশ জোগান দেয় ভোলা। চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে মৎস্য বিভাগ। জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার। এর বাইরেও বিপুলসংখ্যক মানুষ মাছ ধরা ও সংশ্লিষ্ট পেশায় যুক্ত রয়েছেন।

জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের দাবি, ইলিশের সংকটের মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মৎস্য খাতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। তাই জেলেদের জীবনযাত্রার কথা বিবেচনা করে জ্বালানি তেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং মৎস্য খাতকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হুসাইন জানান, হঠাৎ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জেলেদের মাছ ধরার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে, যার ফলে তারা চরম আর্থিক চাপে পড়বেন। জেলেদের পক্ষ থেকে জানানো দাবিগুলো ইতিমধ্যেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।