logo
Advertisement

শিশু নন্দিনী হত্যার নেপথ্যে সামাজিক দ্বন্দ্ব

এশিয়া পোস্ট নিউজ,লালমনিরহাট
শিশু নন্দিনী হত্যার নেপথ্যে সামাজিক দ্বন্দ্ব
শিশু নন্দিনী রায় ও তাকে হত্যায় গ্রেপ্তার বিধান চন্দ্র রায়। ছবি কোলাজ: এশিয়া পোস্ট

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় সাত বছর বয়সি শিশু নন্দিনী রায়ের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। তাকে হত্যা করা হয়েছে জানিয়ে আদালতে স্বীকার করেছেন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার সন্দেহভাজন হত্যাকারী বিধান চন্দ্র রায়।

Advertisement

বুধবার (১৮ জুন) বিকেলে লালমনিরহাটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আলাউদ্দিনের আদালতে হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দেন বিধান। হত্যারকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে সামাজিক দ্বন্দ্ব।

পুলিশ, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এশিয়া পোস্ট জানতে পেরেছে–নন্দিনীকে হত্যা করা হয় গত সোমবার। সেদিন শিশুটি মায়ের কাছ থেকে চেয়ে একটি দেড় আনা ওজনের স্বর্ণের কানের দুল পরে। যেটি তার মা বানিয়েছিলেন বিধানের মাধ্যমে। কয়েক বছর আগে ১০ হাজার টাকা দিয়ে কানের দুলটি বানানো হয়। বিধান পেশায় একজন স্বর্ণকার।

বিধান ও শিশুটির পরিবার পাশাপাশি বসবাস করে। ঘটনার দিন বিকেলে শিশুটি কানের দুল পরে বাড়ির উঠানে হাটছিল। বিধান শিশুটিকে ডেকে নেন। ফোনে ছবি দেখানোর কথা বলে শিশুটিকে পাশের একটি পাটক্ষেতে নিয়ে যান। সেখানে নিয়ে শিশুটির কাছ থেকে কানের দুলটি কেড়ে নেন বিধান। ঘটনা চাপা দিতে শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। হত্যার পর মরদেহ মাটিতে পুঁতে রাখা হয়। পরদিন মঙ্গলবার সকালে বস্তাবন্দি অবস্থায় নন্দিনীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

রণক্ষেত্র ফলিমারী গ্রাম

নন্দিনীর মরদেহ উদ্ধার কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল আদিতমারী উপজেলার ফলিমারী গ্রাম। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন স্থানীয়রা। প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের।

গত মঙ্গলবার নন্দিনীর মরদেহ উদ্ধারের পরই বিধানকে তার নিজ বাড়ি থেকে আটক করেন স্থানীয়রা। পাশের একটি বাড়ি থেকে আটক করা হয় তার বাবা রণজিৎকে। ভাঙচুর করা হয় তাদের বসতঘর। খবর পেয়ে তাদের ধরে আনতে যায় পুলিশ। বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের হাতে তাদের ছেড়ে দিতে চাননি। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে হট্টগোল সৃষ্টি হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ছুটে যান লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) রাশেদুল হক প্রধান, পুলিশ সুপার (এসপি) আসাদুজ্জামান, জেলা পরিষদ প্রশাসক এ কে এম মমিনুল হক এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমামসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা।

বিক্ষুব্ধ জনতা ইটপাটকেল ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালালে ডিসি, এসপিসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। প্রায় তিনঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও বিজিবি সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। হামলায় এসপি ও ওসিসহ প্রায় ২০ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। ভাঙচুর করা হয় ডিসি ও এসপির গাড়িসহ সরকারি সাতটি যানবাহন। এ ঘটনায় কর্তব্যে অবহেলার দায়ে তাৎক্ষণিক আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হককে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে

প্রতিবেশীরা জানান, বিধান অতিমাত্রায় মাদকাসক্ত। মাদক সেবনের টাকার জন্য এলাকায় কয়েকটি চুরির সঙ্গে বিধান জড়িত। নন্দিনীকে হত্যার পেছনে স্বর্ণ ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি রয়েছে সামাজিক দ্বন্দ্ব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিবেশী জানান, বিধানের মা মমতা রানীর উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের কারণে তাদের পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে সমাজচ্যুত বা একঘরে ছিল। সমাজে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে নন্দিনীর কাকা তরণী কান্তের সঙ্গে বিধানের পরিবারের বিরোধ তৈরি হয়। এর জেরে গ্রাম্যসমাজ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন নন্দিনীর কাকা। এই নিয়ে নন্দিনীর পরিবারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন বিধান। এর আগে নন্দিনীর বড় ভাই জ্যোতিষ্ঠিকে পুকুরের পানিতে চুবিয়ে মারার চেষ্টা করেছিলেন বিধান।

নন্দিনীর মা সাবিত্রী রাণী বলেন, ‘বিধানকে তো আমার মেয়ে কাকা ডাকত। সে নিজে প্রথম দিন আমাদের সঙ্গে নাটক করে নন্দিনীকে খোঁজার ভান করেছিল। আমার বুকের ধন তো আর ফিরে আসবে না, আমি ঘাতক বিধান ও তার মা-বাবার ফাঁসি চাই।’

এ বিষয়ে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার (এসপি) আসাদুজ্জামান জানান, আদালতে বিধান হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের ক্ষোভ থেকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেছেন। ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

তদন্তে কমিটি ও মন্ত্রীর আশ্বাস

পুরো ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের চার সদস্যের কমিটির প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে প্রধান করে গঠিত হয়েছে পুলিশের তিন সদস্যের কমিটি।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) রাশেদুল হক প্রধান বলেন, সরকারি কাজে বাধা ও সরকারি সম্পত্তি বিনষ্টের অপরাধে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি মামলার প্রস্তুতি চলছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের চিহ্নিত করা হচ্ছে।

নন্দিনীর মরদেহ উদ্ধারের পর তার বাবা নলিনী কান্ত বাদী হয়ে আদিতমারী থানায় বিধান, তার বাবা রণজিৎ ও মা মমতা রানীকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। মামলার অভিযোগপত্র দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন লালমনিরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও দূর্যোগ ব্যবস্থপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দুপুরে নন্দিনীর বাড়িতে তিনি। সেখানে সাংবাদিকদের মন্ত্রী বলেন, এটি নির্মম ও নৃশংস হত্যাকান্ড। নিন্দা ও দুঃখ প্রকাশের ভাষা নেই।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন নন্দিনীর পরিবারের পাশে দাঁড়াতে। যত ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন তা করতে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জেলার তিনজন সংসদ সদস্য ও জেলার শীর্ষ কর্মকর্তারা এখানে এসেছি।

মন্ত্রী বলেন, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমি যতদুর শুনেছি গ্রেপ্তার ব্যাক্তি হত্যার দায় স্বীকার করেছে। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা রয়েছে, তা সম্পন্ন করে অভিযোগপত্র দিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার বিচার শেষ করা হবে। যারা এতটুকু একটা ছোট শিশুকে হত্যা করতে পারে তারা মানুষ নয়, নরপিচাশ। তাদের এমন দৃষ্ঠান্তমুলক শাস্তি দিতে হবে যাতে উদাহরণ হয়ে থাকে। এমন কাজে আর কেউ যুক্ত হতে সাহস না করে।

তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং আমাদের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। তারা আসামিকে গ্রেপ্তার করে শান্তিপূর্ণভাবে ফিরছিলেন। সেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কার ইন্ধনে, কার উসকানিতে, কার প্রোরোচনায় প্রশাসনকে আক্রমন করা হয়। এটি আরেকটি অপরাধ। আইন হাতে তুলে নিয়েছে তারা। এতে কারও উসকানি আছে কি না? সেটি পুলিশ তদন্ত করে দেখছে। সাধারন মানুষ যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়, তারা নিশ্চিতে বাড়িতে থাকবে। কিন্তু যারা অপরাধী, যারা প্রশাসনকে আক্রমন করে মব সৃষ্ঠি করে তারা অপরাধী। যারা এ অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে।