
পাবনার শিশু শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার কলি হত্যা মামলার দুই প্রধান আসামি মো. মোস্তফা কামাল (৪০) ও মো. ইয়াছিন আলী (২১) এখন কারাগারে। তবে আসামির মোস্তফার বাড়িতে গত সাত দিন ধরে ভাঙচুর চলছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকে শুরু হওয়া এ ভাঙচুর আজ বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত থামেনি। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্থানীয়দের পাশাপাশি অন্য জেলা থেকেও মানুষ এসে বাড়িটির দেয়াল, দরজা-জানালা ও বিভিন্ন অংশ ভেঙে নিয়ে যাচ্ছেন। ঘরের আসবাবপত্রও নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, শুরুতে ক্ষোভ থেকে কয়েকজন বাড়িটিতে হামলা চালালেও পরে বিষয়টি অনেকটা উৎসুক জনতার ভাঙচুরে পরিণত হয়েছে। খবর পেয়ে দূর-দূরান্ত, এমনকি অন্য জেলা থেকেও মানুষ বাড়িটি দেখতে আসছেন। কেউ ভবনের অংশ ভাঙছেন, কেউ দরজা-জানালা খুলে নিচ্ছেন, আবার কেউ ঘরের বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছেন। এতে কয়েক দিনের মধ্যেই বাড়িটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে ৫ থেকে ৭ জনের দল যন্ত্রপাতি এনে ভবনের রড কেটে একত্র করে নিয়ে বাজারে বিক্রি করছেন।
বহুতল ভবন ভাঙতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকারও হচ্ছেন অনেকে। জানা গেছে, গতকাল বুধবার দুপুরের দিকে একটি শিশুর মাথায় ইটের খণ্ড পড়ে মাথা ফেটে গিয়েছে। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এছাড়া বেশ কয়েকজনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুর রউফ সোহেল বলেন, ‘বাড়িটিতে প্রতিদিন স্থানীয় লোকজন তো আসছেই, আবার অন্য জেলা থেকেও ভবন ভাঙতে মানুষ আসছে। এখন বাড়িটির আসবাবপত্র বলতে কিছুই নেই। সবই মানুষ নিয়ে গেছে। সাজানো বাড়ি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।’
মোস্তফার মেয়ে সুবর্না খাতুন ভিডিও বার্তায় বলেন, আমরা তো সবকিছু হারা হলাম। এতো কষ্ট করে লেখাপড়া করলাম সার্টিফিকেট পর্যন্ত বাড়িতে নেই। সবই নিয়ে গেছে। যে সার্টিফিকেট নিয়েছেন দিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, মোস্তফা কামাল প্রায় ১২ বছর মালয়েশিয়ায় ছিলেন। ২০১৮ সালে দেশে ফিরে দীর্ঘদিনের উপার্জন দিয়ে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। দুইতলার কাজ শেষ হওয়ার পর সম্প্রতি তৃতীয় তলার নির্মাণকাজও শুরু করেছিলেন। বিল্ডিংয়ের নিচতলায় দিয়েছিলেন মুদি দোকান। পাশাপাশি সুতার ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তার পরিবার। মেয়ের বিয়ে হয়েছে এবং তিনি নারায়ণগঞ্জে স্বামীর সঙ্গে থাকেন। ছেলে প্রায় ২০১৯ সালের দিকে কর্মসংস্থানের জন্য মালয়েশিয়ায় যান। প্রায় দুই বছর আগে বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে সেখানেই বসবাস করছেন।
গত ৯ সেপ্টেম্বর আসামি মোস্তফা ফুঁসলিয়ে শিশু কলিকে মোস্তফার মুদি দোকানের পেছনে শোবার ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করেন। শিশু কলি প্রতিবেশী হওয়ায় আসামিরা তাকে সরাসরি মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন এবং শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ১৬ সেপ্টেম্বর আসামি মোস্তফাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর ক্ষুব্ধ জনতা প্রধান আসামি মোস্তফার বাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়। বর্তমানে সেখানে পড়ে আছে চারদিকে ভাঙা ইট, দেয়ালের অংশ, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নির্মাণসামগ্রী ও ধ্বংসাবশেষ।
স্থানীয়দের দাবি, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ভবনটির প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি ভেঙে ফেলা হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই ভবনের অবশিষ্ট অংশও মাটিতে মিশে যেতে পারে।
এদিকে আসামির বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনায় পাবনার বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, কোনো অপরাধের অভিযোগে কেউ অভিযুক্ত হলেও তার বাড়িঘর বা সম্পদে হামলা চালানোর অধিকার কারও নেই। আসামির বিচার আদালতেই হওয়া উচিত। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বাড়িঘর ভাঙচুর করলে তা নতুন করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে।
তারা আরও বলেন, টানা সাত দিন ধরে বাড়িটিতে ভাঙচুর চললেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি ও তা বন্ধে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
পাবনা জেলা হিউম্যান রাইটস মনিটরিং কর্মকর্তা কামাল আহমেদ সিদ্দিকী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘একজন আসামি তার অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি পাবেন এটাই আমরা সবাই চাই। কিন্তু তার বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে তার পরিবারের অন্য সদস্যদের নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। কোনো সভ্য সমাজে এ ধরনের আচরণ কাম্য নয়। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হচ্ছে না।’
পাবনা অ্যাডভোকেট বার সমিতির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মাসুদ খন্দকার এশিয়া পোস্টকে বলেন, যে ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধ করেছে, তার সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি হোক—এটাই পাবনাবাসীর দাবি। সে অপরাধ করেছে এবং বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। কিন্তু তার বাড়িতে যারা ভাঙচুর করছে, তারাও আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। এটি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। যারা ভাঙচুর করছে, তারাও এ ঘটনায় অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
পাবনা ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সালাম বলেন, ‘মামলায় অভিযুক্ত দুজনকে গ্রেপ্তারের পর পুরো রহস্য দ্রুত সময়ের মধ্যে উদঘাটন করা হয়েছে। মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে দ্রুত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। তবে বাড়ি ভাঙতে আসা উৎসুক জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
প্রসঙ্গত, ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার কলি। সাত দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে কুলোনিয়া গ্রামের বাড়ির পাশের ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় তার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় প্রতিবেশী মোস্তফা কামাল ও তার ভাড়াটিয়া ইয়াছিন আলীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, ৯ সেপ্টেম্বর মাগরিবের পর মোস্তফার দোকানের পেছনের রুমে কলিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ বস্তাবন্দি করে ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়।
পুলিশ আরও জানায়, ঘটনা আড়াল করতে আসামিরা নিজেরাই কলিকে খোঁজার কাজে অংশ নিয়েছিলেন। রিমান্ডে মোস্তফা ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশের দাবি। তবে ইয়াছিন ধর্ষণ বা হত্যার কথা অস্বীকার করে হত্যার পর সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় আলামত ফরেনসিক বিভাগে পাঠিয়েছে। সেখান থেকে রিপোর্ট আসলেই পুর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে।
