রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে সাইবার আস্তানা, গ্রেপ্তার ৬ বিদেশি রিমান্ডে

কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন রিসোর্টে গোপন আস্তানা গেড়ে আন্তর্জাতিক সাইবার প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার চীন ও তাইওয়ানের ৬ নাগরিকের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম এস এম গিয়াস উদ্দিনের আদালত এই রিমান্ড আদেশ দেন।
মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শওকত ওসমান বলেন, আসামিদের অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আরও গভীরভাবে তদন্ত এবং জব্দ করা ডিভাইসগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছিল। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান বলেন, সাইবার অপরাধের সত্যতা উদ্ঘাটন যেমন জরুরি, তেমনি গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পর্যটন বা অন্য কোনো বৈধ কাজে বাংলাদেশে এসে থাকলে তাদের আইনগতভাবে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যথায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে।
এর আগে, সকাল ৯টার দিকে ৬ বিদেশি নাগরিককে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে আদালতের আদেশ অনুযায়ী তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত ১ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুর হিমছড়ি সমুদ্রসৈকতের পাশে তিনটি রিসোর্ট ও একটি আবাসিক ভবন ভাড়া নিয়ে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্রের আস্তানা গড়ে তোলার অভিযোগ ওঠে। পরে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে মামলা করে রামু থানা পুলিশ। পুলিশের মামলায় উল্লেখ করা হয়, আড়াই থেকে তিন শতাধিক চীন ও তাইওয়ানের নাগরিক সেখানে অবস্থান করে গোপনে কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন। একটি রিসোর্টের হলরুমে কম্পিউটার ল্যাব তৈরি করা হয়েছিল। পাশাপাশি তৈরি করা হয় ছয়টি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত মার্চে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন চীন ও তাইওয়ানের নাগরিক বাংলাদেশে আসেন। পরের মাসে তারা রামুর মেরিন ড্রাইভের মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট, ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড বু রিসোর্ট এবং ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের একটি আবাসিক ভবন ভাড়া নেন। রিসোর্টগুলো ভাড়া নেওয়ার পর ভবনগুলোর পুরোনো সেটআপ পরিবর্তন, নতুন করে সাজসজ্জা, নিরাপত্তাকর্মী ও জনবল নিয়োগসহ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থাও বিদেশি নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
পুলিশের ধারণা, মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের হলরুমে তৈরি করা কম্পিউটার ল্যাব ও সাউন্ডপ্রুফ কক্ষগুলোতে বিভিন্ন মডেলের আইফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে গোপনে কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, অভিযানের সময় ওই রিসোর্টের একটি হলরুম থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কিবোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস ও ২৪টি কানেকশন বোর্ডসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া চীনা পুলিশের র্যাংক ব্যাজ, চীনের জাতীয় পতাকা এবং পুলিশ লোগোযুক্ত একটি টাই উদ্ধারের কথাও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, উদ্ধার করা আলামত প্রথমে মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের জেনারেল ম্যানেজারের হেফাজতে রাখা হয়েছিল। পরে ৩ সেপ্টেম্বর সাক্ষীদের উপস্থিতিতে জব্দ তালিকামূলে সেগুলো পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়।
পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল থেকেই বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। বিদেশি নাগরিকেরা আবাসিক হোটেলে অবস্থান করলে তাদের পাসপোর্টের কপি ও অন্যান্য তথ্য ডিএসবি কার্যালয়কে জানানোর নিয়ম থাকলেও চারটি প্রতিষ্ঠান বিদেশিদের ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি গোপন রেখেছিল। পরবর্তীতে ডিএসবি কর্মকর্তারা রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা জানান, ‘বাবর আলী’ নাম ব্যবহার করে চীনের নাগরিক ঝান ইউয়ান ফান এপ্রিল থেকে রিসোর্টগুলো ভাড়া নেন।
পুলিশের বিশেষ শাখার ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে ‘জিন শিন নির্মাণ কোম্পানি’ নামে একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানি স্থাপনের কাজের অংশ হিসেবে তারা সেখানে অবস্থান করছেন বলে জানানো হয়েছিল। তবে ডিএসবি অনুসন্ধানে এ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
পুলিশ জানায়, পরে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বাংলাদেশে অবস্থানের বৈধতা, উদ্দেশ্য, ভিসা ও কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু তারা সন্তোষজনক তথ্য বা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি স্থাপনের পক্ষে কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের দাবি, চক্রটি অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগে গত ২৫ আগস্ট অভিযানের আগে চক্রটির সদস্যরা পালিয়ে যান। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিটিটিসি) একটি দল।
মামলার এজাহারে আরও চারজন চীনা নাগরিকের নাম উল্লেখ করে তাদের পলাতক দেখানো হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় রামু থানায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২১, ২২, ২৪ ও ২৭ ধারায় মামলা করা হয়। পরে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
