অলিগলি থেকে খেলার মাঠ, চলছে মাদক কেনাবেচা

রাজধানীর অদূরে ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ কেরানীগঞ্জে উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে মাদকের বিস্তার। এই উপজেলার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা, অলিগলি, নির্জন স্থান, এমনকি খেলার মাঠেও ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের কেনাবেচার অভিযোগ উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে না আসায় উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের মধ্যে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করা নিয়ে শঙ্কিত তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধভাবে চলছে মাদক কেনাবেচা। কোথাও প্রকাশ্যে, আবার কোথাও গোপনে হাতবদল হচ্ছে নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য। একশ্রেণির অসাধু কারবারি ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এসব ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে খুচরা বিক্রেতারা গ্রেপ্তার হলেও নেপথ্যে থাকা মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় দলিল লেখক মো. নাছির উদ্দিন বলেন, কেরানীগঞ্জে মাদকের বিস্তার দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সের ছেলেরা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না, একটি পরিবারকেও শেষ করে দেয়। প্রশাসনের কাছে দাবি, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
স্থানীয়দের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, একসময় যেসব মাঠে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা আর তরুণদের আড্ডায় মুখর থাকত, সেসব স্থানের কিছু অংশ এখন মাদকসেবী ও কারবারিদের বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সন্ধ্যা নামলেই বিভিন্ন নির্জন স্থান ও গলির মোড়ে অপরিচিত ব্যক্তিদের আনাগোনা বাড়ে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের পরিবেশে সহজেই মাদকের সংস্পর্শে আসছে উঠতি বয়সের কিশোররা।

রিকশাচালক কাউসার আহমেদ বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ রাস্তাঘাটে চলাচল করি। বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর কিছু জায়গায় মাদকসেবীদের আনাগোনা দেখা যায়। এতে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। আমাদের সন্তানরা বাইরে বের হলে চিন্তায় থাকতে হয়। মাদক বিক্রি বন্ধে পুলিশি টহল ও নজরদারি আরও বাড়ানো দরকার।
স্কুল শিক্ষক আরিফ হোসেন বলেন, মাদকের কারণে অনেক তরুণের জীবন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কাজকর্ম না করে অনেকে মাদকের পেছনে সময় ও টাকা ব্যয় করছে। এখন কিশোরদের মাঠে খেলতে দেখা যায় না। তারা দেখা করে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য। আমরা চাই, প্রশাসন শুধু মাঝেমধ্যে অভিযান না চালিয়ে নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করুক। যারা মাদকের মূল ব্যবসায়ী, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
কেরানীগঞ্জে মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করছে। এসব অভিযানে মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের পর কিছুদিন মাদক কারবারিদের তৎপরতা কমলেও পরে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে চক্রগুলো।
আগানগর এলাকার বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম বলেন, আগানগরসহ কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চিন্তিত। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে। আমাদের দাবি, কেরানীগঞ্জকে মাদকমুক্ত করতে স্থায়ী ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
স্থানীয়দের মতে, মাদকবিরোধী অভিযানে খুচরা বিক্রেতাদের পাশাপাশি সরবরাহকারী, অর্থের জোগানদাতা এবং নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা জরুরি। তা না হলে বিচ্ছিন্ন অভিযানে মাদকের বিস্তার সাময়িকভাবে কমলেও স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছেন ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. তরিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। জেলা পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।

