সাভার/৯০ শতাংশ ভাড়াটিয়ার তথ্য নেই, জঙ্গি আস্তানাসহ বাড়ছে খুন

আশুলিয়ার বাসাইদ এলাকায় রোববার (১৬ আগস্ট) রাতে একটি ভাড়া বাসা থেকে অর্ধগলিত মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কিন্তু নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করতেই পার হয়েছে প্রায় সাত ঘণ্টারও বেশি সময়। অথচ ওই বাসার বাড়িওয়ালা নিহতের কোনো তথ্যই দিতে পারেননি। এমনকি নিহতের সঙ্গে থাকা অপর ব্যক্তির ফোন নম্বর পর্যন্ত বলতে পারেননি তিনি। এর দুদিন আগেই জামগড়া এলাকায় অজ্ঞাত এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের একই ঘটনার সাক্ষী হয় আশুলিয়া থানা পুলিশ। এমনকি ভুয়া পরিচয়ে সাভারের শ্যামপুরে ‘জঙ্গি আরিফ’ বাসা ভাড়া নিয়ে আস্তানা তৈরির ঘটনাতেও উঠে এসেছে ভাড়াটিয়া ফরম বা তথ্য সংগ্রহ না করার ভয়াবহ চিত্র।
তথ্যমতে, ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের বসবাস। পোশাক কারখানা অধ্যুষিত এই এলাকায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের ভিড়ে সহজে মিশে যাচ্ছে অপরাধীরা। বিভিন্ন জেলার সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিসহ রয়েছে কুখ্যাত অপরাধীরাও। সহজে বাসা পাওয়া ও পরিচয় আড়ালে রাখতে সাভার ও আশুলিয়া যেন এক টুকরো সংরক্ষিত অভয়াশ্রম।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সাভার ও আশুলিয়া এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ ভাড়াটিয়ারই সঠিক ও হালনাগাদ তথ্য প্রশাসনের কাছে নেই। পোশাক শ্রমিকদের কারখানাগুলোতে নিজস্ব ডাটাবেজ থাকলেও যেসব বাসায় তারা বসবাস করছেন সেখানে তথ্য সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। গত এক বছরে সাভার ও আশুলিয়ায় ১৫টির অধিক অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশের পরিচয় শনাক্তে বেশ জটিলতায় পড়তে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাসা-বাড়িগুলোতে তথ্য সংরক্ষণের চিত্র নেই বললেই চলে। বিশেষ করে ব্যাচেলর বাসাগুলোতে ভাড়াটিয়াদের তথ্য রাখা হচ্ছে নামমাত্র ফোন নম্বর কিংবা পরিচিত ব্যক্তির সূত্রে। বেশি ভাড়ার লোভে ও ঘনঘন ভাড়াটিয়া বদলের বাহানায় অধিকাংশ বাড়িওয়ালা জাতীয় পরিচয়পত্র বা ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম সংগ্রহ করেন না। ফলে এসব ব্যাচেলর বাসা অপরাধীদের সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। এতে কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আসামিরা অনায়াসে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এমনকি উগ্রবাদীরা ছদ্মবেশে নাশকতার চক্রান্ত করার সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকার কুখ্যাত ডাকাত ও সন্ত্রাসী চক্র সাভার-আশুলিয়াকে তাদের নিরাপদ আস্তানা বানিয়ে নিচ্ছে।
স্থানীয় বাড়িওয়ালা শিরীন আক্তার বলেন, পোশাক শিল্পাঞ্চল হওয়ায় আমাদের এখানে ঘনঘন ভাড়াটিয়া পরিবর্তন হয়। ঝামেলা এড়াতে আমরা জাতীয় পরিচয়পত্র বা ফরম পূরণ ছাড়াই ভাড়া দিয়ে থাকি। তবে এখন থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য ফরম নেওয়া ছাড়া কোনো ভাড়াটিয়াকে বাসায় উঠতে দেওয়া হবে না।
ডেন্ডাবর এলাকার দীর্ঘ সাত বছরের স্থায়ী ভাড়াটিয়া আমিনুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই একই এলাকায় বসবাস করছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো বাড়িওয়ালা আমার কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি কিংবা ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম চাননি। বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় শুধু অগ্রিম টাকা আর মৌখিক পরিচয়েই রুম পাওয়া যায়। আশপাশের প্রায় সব বাসাতেই একই নিয়ম চলছে।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রাশেদুজ্জামান বলেন, সম্প্রতি জামগড়া থেকে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করি। কিন্তু নিহতের নাম পরিচয় নিশ্চিত করতে কষ্ট হয়েছে। দুদিন আগে তারা বাসা ভাড়া নিয়েছে অথচ বাড়িওয়ালা তাদের একটি মোবাইল নম্বরও রাখেননি। একটি ফোন নম্বর অন্তত সংগ্রহে থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হতো। তথ্য না থাকায় তদন্তে যেমন বিলম্ব হয় তেমনি অপরাধীরাও পালিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীতে ওই মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-কে খবর দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, সাভার-আশুলিয়ায় ৯০ শতাংশের বেশি ভাড়াটিয়ার সঠিক তথ্য কারও কাছে নেই। ট্রেড লাইসেন্সধারী অন্য ব্যবসায়ীদের মতো বাড়িওয়ালাদের তথ্যও ইউনিয়ন পরিষদ বা থানায় থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত। হোল্ডিং নম্বর ধরে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ করা গেলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অনেকাংশে কমে আসবে।
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশান বলেন, সাভার ও আশুলিয়া এলাকা অত্যন্ত জনবহুল ও শিল্পকেন্দ্রিক। আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে ঢাকা জেলাজুড়ে ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার। একটি সেলফ-রেজিস্ট্রেশন ভিত্তিক অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি। তবে সরাসরি ভাড়াটিয়া বা বাড়িওয়ালার তথ্য সংগ্রহ করা মূলত পুলিশিং কাজের আওতাভুক্ত নয়। এটি পৌরসভা বা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের কাজ হওয়া উচিত। তা সত্ত্বেও নিরাপত্তার তাগিদে ক্রাইম ডিটেকশন ও অপরাধ দমনে গতি আনতে আমরা নিজেদের উদ্যোগেই এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রযুক্তিগত সহায়তার বিষয়ে পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এম এন মুরশেদ জানান, অজ্ঞাতনামা বা পরিচয়হীন মরদেহ উদ্ধার হলে পিবিআই নিজস্ব প্রযুক্তির সাহায্যে পরিচয় শনাক্তের কাজ করে। তবে যেকোনো অপরাধ তদন্ত ও আসামি শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়া ফরম বা বায়োডাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সঠিক তথ্য ও পরিচয়পত্র সংরক্ষিত থাকলে যেকোনো অপরাধের রহস্য উদঘাটন ও আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের আলোচিত টুটুল হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি সুরুজ মিয়া ওরফে সৌরভ আশুলিয়ার পলাশবাড়ী কামাল গেট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ফরিদপুরের আলোচিত অটোরিকশা চালক হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক আসামিকে ঢাকার আশুলিয়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। শেরপুর জেলার একটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মো. বারেক আলী (৫০)-কেও আশুলিয়া থেকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১৪-এর সিপিসি-১।
সবশেষ সাভারের হেমায়েতপুরে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) একটি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে সংগঠনের সক্রিয় সদস্য আরিফকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে পাইপ বোমা, গানপাউডার, সায়ানাইডসহ বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম।
বাড়ির মালিক ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া পরিচয় দিয়ে পরিবার নিয়ে থাকার কথা বলে চলতি মাসের ২ আগস্ট ওই বাড়ির নিচতলার একটি কক্ষ ভাড়া নেন আরিফ। এই আস্তানায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ও বোমা কারিগর ‘বোমারু মামুন’ আসা-যাওয়া করতেন বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।




