কৌশলে কোটি টাকার সম্পত্তি লিখে নেওয়ার অভিযোগ পালক ছেলের বিরুদ্ধে

নিজের কোনো সন্তান ছিল না আমিনুর রহমানের। তাই ১৪ বছর আগে এক শিশুকে নিজের সন্তানের মতো ঘরে তুলেছিলেন। লেখাপড়া করিয়ে পরবর্তীতে সেই পালক ছেলের সঙ্গেই নিজের স্ত্রীর ছোট বোনের মেয়ে শিউলির সঙ্গে বিয়ে দেন। কিন্তু জীবনের শেষ বয়সে এসে সেই ছেলের প্রতারণার স্বীকার হয়েছেন তিনি।
আমিনুর রহমানের ভাষ্যমতে, অচেতন করার ওষুধ খাইয়ে কৌশলে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ টাকা মূল্যের সম্পত্তি লিখে নেন পালক ছেলে। সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর ৭০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধকে ঠিকমতো খাবার-চিকিৎসা না দেওয়া এবং খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
নীলফামারী উপজেলার গয়াবাড়ি ইউনিয়নের কলেজপাড়া গ্রামের এ ঘটনায় ডিমলা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন আমিনুর রহমান। পালক ছেলে রাকিবুল ইসলাম রাজু (৪২), তার স্ত্রী শিউলি বেগম (৩২) ও শিউলির বাবা দবির উদ্দিনের (৫৫) বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করা হয়েছে।
থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে আমিনুর রহমান জানান, তার কোনো সন্তান না থাকায় প্রায় ১৪ বছর আগে রাকিবুল ইসলাম রাজুকে পালক নিয়ে লালন-পালন করে বড় করেন। পরে তার স্ত্রীর রাহেনা খাতুনের ছোট বোনের মেয়ে শিউলি বেগমের সঙ্গে রাকিবুলের বিয়ে দেন। রাহেনা খাতুন ১০ বছর আগে মারা যাওয়ায় সংসারে অশান্তির কারণে তিনি আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি।
অভিযোগ অনুযায়ী, জমি লিখে নেওয়ার পর রাকিবুল ও শিউলি তাকে সংসার থেকে বিতাড়িত করার চেষ্টা করতে থাকেন। প্রায় ১২ বছর আগে তাকে অচেতন করার ওষুধ খাইয়ে কৌশলে তার সব সম্পত্তি রাকিবুলের নামে লিখে নেন। অভিযোগপত্রে ওই সম্পত্তির মূল্য প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর বিষয়টি জানতে পারলে আমিনুর রহমানকে ভরণপোষণ ও দেখাশোনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। বরং তাকে বিভিন্নভাবে মানসিক চাপ ও অশালীন আচরণের শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ঠিকমতো খাবার না দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা না করার অভিযোগও করেছেন তিনি। এ ছাড়া চলতি বছরের ৩ আগস্ট খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে তার হত্যার চেষ্টা করা হয়।
আবেগাপ্লুত আমিনুর রহমান বলেন, যাকে নিজের সন্তানের মতো করে লালন-পালন করে বড় করেছি, জীবনের শেষ সময়ে এসে তার কাছ থেকেই এমন আচরণের শিকার হতে হবে, তা কখনো ভাবিনি। এখন আমার নিজের বলতে কিছুই নেই। চিকিৎসার খরচ চালাতেও কষ্ট হয়। এই বয়সে আমি নিরাপদে বাঁচতে চাই। একটু সুস্থতা চাই।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে চাকরি করতেন আমিনুর। ২০১৬ সালে তিনি অবসর নিয়েছেন। চাকরি শেষে পাওয়া অবসরকালীন অর্থ একযোগে খরচ করে পারিবারিক কাজে ও সংসারে ব্যয় করেছেন। বর্তমানে তার হাতে জমানো কোনো টাকা নেই। সামান্য মাসিক অর্থ দিয়ে সংসার ও চিকিৎসার খরচ চালাতে হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন ডিমলা থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) শফিউল আলম। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে উভয় পক্ষের কথা শুনেছি। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গেও কথা বলেছি এবং বিষয়টি ওসি মহোদয়কে জানিয়েছি।
ডিমলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আশরাফুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, বিষয়টি আমি জেনেছি, সেই ব্যক্তির সাথে কথা বলেছিলাম। আমি তাকে এবং তার ছেলেকে আসতে বলেছি। বিষয়টি পারিবারিক, কিন্তু তিনি অসহায় হয়ে আমাদের কাছে এসেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার সাথে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেছি এবং যত দ্রুত সম্ভব বিষয়টি নিয়ে বসার চেষ্টা করছি, সমাধানের চেষ্টা করছি।

