logo

বরিশাল মহাশ্মশানে দীপাবলি উৎসব, প্রদীপের আলোয় স্মরণ প্রয়াত স্বজনদের

বরিশাল মহাশ্মশানে দীপাবলি উৎসব, প্রদীপের আলোয় স্মরণ প্রয়াত স্বজনদের
প্রদীপের আলোয় প্রয়াতদের স্মরণ করেন স্বজনেরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

মোমবাতি আর প্রদীপের আলোয় আলোকিত বরিশালের ঐতিহ্যবাহী মহাশ্মশান। ফুলে ফুলে সাজানো হয়েছে প্রয়াত স্বজনদের সমাধি। কোথাও চলছে প্রার্থনা, কোথাও নামকীর্তন। আবার কোথাও প্রিয়জনের সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে স্মৃতিচারণ করছেন স্বজনেরা। পূর্বপুরুষ ও প্রয়াত আত্মীয়-স্বজনদের স্মরণে প্রতিবছরের মতো এবারও বরিশালে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী শ্মশান দীপাবলি উৎসব।

শনিবার (৭ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নগরীর কাউনিয়া এলাকার বরিশাল মহাশ্মশানে শুরু হয় এ উৎসব। রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত চলে নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। এতে দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন স্থান থেকে আসেন হাজারো মানুষ।

প্রায় ছয় একর জমির ওপর বিস্তৃত পশ্চিম কাউনিয়া ও নতুন বাজার এলাকার এই মহাশ্মশান। প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো এই শ্মশানে রয়েছে ৭০ হাজারের বেশি মঠ। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, নগরীর পত্তনেরও আগে ধনাঢ্য জমিদারদের আর্থিক সহায়তায় নতুন বাজার এলাকায় মহাশ্মশানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে জায়গার সংকট দেখা দিলে পাশের কাউনিয়া এলাকায় নতুন করে শ্মশান প্রতিষ্ঠা করা হয়। আয়তন ও মঠের সংখ্যার কারণে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মহাশ্মশান হিসেবে পরিচিত।

বরিশাল মহাশ্মশানে দীপাবলি উৎসব। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বরিশাল মহাশ্মশানে দীপাবলি উৎসব। ছবি: এশিয়া পোস্ট

১৯২৭ সাল থেকে এখানে উদযাপিত হয়ে আসছে শ্মশান দীপাবলি। কালীপূজার আগের দিন ভূত চতুর্দশীর পুণ্য তিথিতে প্রতিবছর এ আয়োজন করা হয়। এদিন প্রয়াত স্বজনদের সমাধিতে প্রদীপ, মোমবাতি ও ধূপ জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জানান স্বজনেরা। ফুল দিয়ে সাজিয়ে তোলেন সমাধি। কেউ কেউ নিয়ে আসেন প্রয়াত ব্যক্তির জীবদ্দশায় পছন্দের খাবার। ইলিশ মাছ, পায়েসসহ নানা খাবার নিবেদন করেন সমাধিতে।

সন্ধ্যা নামতেই হাজারো প্রদীপ ও মোমবাতির আলোয় বদলে যায় পুরো মহাশ্মশানের চিত্র। ধর্মীয় প্রার্থনা ও নামকীর্তনের পাশাপাশি অনেককে প্রয়াত স্বজনদের স্মরণে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। দীর্ঘদিন পর সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে কেউ স্মৃতিচারণ করেন, কেউ নীরবে প্রার্থনা করেন প্রিয়জনের আত্মার শান্তি কামনায়।

ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিক থেকেও বরিশাল মহাশ্মশানের রয়েছে বিশেষ পরিচিতি। এখানে সমাহিত রয়েছেন কবি জীবনানন্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাশ ও পিতামহ সর্বানন্দ দাশ। এছাড়া ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ, কালিচন্দ্র ঘোষ ও মনোরমা বসু মাসিমাসহ বিভিন্ন সময়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে এখানে। বাঙালি রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও লেখক অশ্বিনী কুমার দত্তের চিতাভস্মও সংরক্ষিত রয়েছে এই মহাশ্মশানে। মৃত্যুর প্রায় ৮০ বছর পর ২০১২ সালে ভারতের কেওড়াতলা মহাশ্মশান থেকে তাঁর চিতাভস্ম এনে এখানে স্থাপন করা হয়।

উৎসবে আসা জয়দেব সাহা বলেন, প্রয়াত আত্মীয়-স্বজনের আত্মার শান্তি কামনা এবং তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই প্রতিবছর এখানে আসেন তারা। জীবিত অবস্থায় প্রিয়জন যেসব খাবার পছন্দ করতেন, সেসব খাবারও সমাধিতে নিয়ে আসেন স্বজনেরা। এরপর প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন।

উজ্জ্বল দাস বলেন, দীপাবলি উৎসবের আগে মৃত স্বজনের সমাধি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে রং করিয়েছেন। উৎসবের দিন মোমবাতি ও প্রদীপ দিয়ে সাজিয়েছেন সমাধি। অনেক সমাধিতে স্বজনেরা আসেন না। সেসব সমাধিতেও মোমবাতি জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জানান তিনি। পূর্বপুরুষদের স্মরণে প্রতিবছরই এখানে আসেন বলে জানান তিনি।

বরিশাল মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজয় ভক্ত বলেন, শনিবার বিকেল থেকেই দর্শনার্থীদের সমাগম শুরু হয়। তাঁদের নিরাপত্তায় স্বেচ্ছাসেবকেরা কাজ করছেন। এর আগে পুরো মহাশ্মশান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে পুরো এলাকায় আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শ্মশান দীপাবলি ও পরদিন কালীপূজা উপলক্ষে আয়োজনের কোনো কমতি রাখা হয়নি।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) সুশান্ত সরকার বলেন, শ্মশান দীপাবলির নিরাপত্তায় প্রায় ৩০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পাশাপাশি এসআরবি-৮-এর সদস্যরাও নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন। এ ছাড়া সাদাপোশাকে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নজরদারি করছেন। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় মহাশ্মশানের ভেতরে নির্দিষ্ট স্থানে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ফুট প্যাট্রোলও পরিচালনা করা হচ্ছে।