logo

সীমান্তে সাপ-কুমির আতঙ্ক কি বায়োপলিটিক্যাল ভায়োলেন্স

সীমান্তে সাপ-কুমির আতঙ্ক কি বায়োপলিটিক্যাল ভায়োলেন্স

খবর এসেছে বাংলাদেশ সীমান্তে বিষধর সাপ ও হিংস্র কুমির মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকাতে বিএসএফের এই পরিকল্পনা জেনে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বাসিন্দারা। তবে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিজিবি) আনুষ্ঠানিক কোনো বার্তা দেয়নি বিএসএফ। এমন প্রেক্ষাপটে পরিকল্পনার বাস্তবতা নিয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। 

তবে শঙ্কা উড়িয়ে না উড়িয়ে পরিবশেবীদ ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, প্রাণী কখনও অনুপ্রবেশকারী ও সাধারণ নাগরিকের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে না। বন্যার সময় সাপ ও কুমির লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়লে দুই দেশের মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়বে। এটি দুই দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করবে। এমন পদক্ষেপ হবে ‘বায়োপলিটিক্যাল ভায়োলেন্স’ বা প্রকৃতির মাধ্যমে মানুষের ওপর সহিংসতা।

বিএসএফের পরিকল্পনা কী
বিভিন্ন মাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে–গত ২৬ মার্চ বিএসএফ সদর দপ্তর থেকে একটি অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা জারি করা হয়। সেখানে ভারতের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ইউনিটগুলোকে নদীমাতৃক এলাকায় হিংস্র সরীসৃপ মোতায়েনের ‘সম্ভাব্যতা’ যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়।

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশনায় এই পরিকল্পনার কাজ শুরু হয়েছে। এর আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারের সভাপতিত্বে এক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার চার হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার এলাকা অত্যন্ত দুর্গম। বিশেষ করে ১৭৫ কিলোমিটার এলাকা নদী ও জলাভূমি হওয়ায় সেখানে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া প্রায় অসম্ভব।

বিএসএফের দাবি, এই ফাঁকা জায়গাগুলো দিয়ে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রবেশ ও অপরাধ সংঘটিত হয়। তাই বিকল্প হিসেবে এই ‘বায়োলজিক্যাল ফেন্সিং’ বা জৈবিক বেড়া দেওয়ার কথা ভাবছে দেশটি।

পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত
সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় এবং মিজোরাম রাজ্যের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। বড় একটি অংশ জলাভূমি ও নদীপথ; দুই পাশেই ঘন জনবসতি রয়েছে।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গত বছরের এক প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে–নদী এলাকা, সীমান্তের কাছাকাছি জনবসতি এবং ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে কিছু জায়গায় বেড়া দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বেড়া দিতে না পারা এলাকায় সরীসৃপ মোতায়েনের পরিকল্পনাকে ভয়ংকর হিসেবে বর্ণনা করেছেন ভারতীয় গবেষক অংশুমান চৌধুরী। তিনি বলেন, এটি হাস্যকর মনে হলেও আসলে অত্যন্ত বিপজ্জনক। কোনো কুমির বা সাপ কি চিনতে পারবে–কে বাংলাদেশি, কে ভারতীয়? এটি অভিবাসীদের প্রতি চরম অমানবিকতা এবং প্রকৃতিকে মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের একটি নতুন রূপ।

ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়ার স্ট্র্যাটেজি প্রধান রথীন বর্মন বলেন, বাংলাদেশ সীমান্তের নদীগুলোতে কুমির প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় না। সুন্দরবন বা আসামের সংরক্ষিত এলাকায় কুমির থাকলেও এই সীমান্ত অঞ্চলে তারা বেঁচে থাকতে পারবে না।

তিনি বলেন, কোনো প্রাণীকে জোর করে নতুন পরিবেশে নিয়ে এলে পুরো বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া এই এলাকাগুলো বন্যাপ্রবণ। বন্যার সময় এই বিষধর সাপ বা কুমিরগুলো লোকালয়ে ঢুকে পড়বে; যা সীমান্ত সংলগ্ন গ্রামবাসী ও জেলেদের জীবনের জন্য চরম ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশ সীমান্তে উদ্বেগ
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের লালমনিরহাটে ২৮১ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা। এই অঞ্চলে তিস্তা ও ধরলা নদীর অববাহিকায় বসবাস করেন কয়েক লাখ মানুষ। আসন্ন বর্ষা ও বন্যার আগে ‘বিষাক্ত’ প্রাণী লোকালয়ে চলে আসতে পারে–এমন আশঙ্কায় উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন তারা।

সীমান্তবর্তী কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তারা শুনেছেন ড্রোন দিয়ে সাপ ও কুমির ছাড়া হবে। এমন অমানবিক পরিকল্পনার কথা শুনে চরের কৃষকরা গবাদি পশু মাঠে নিতে ভয় পাচ্ছেন।

লালমনিরহাটের গড্ডিমারী এলাকার কৃষক রহমত আলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘হামরা দিন আনি দিন খাই। এ্যালা শুনোছি ওপার থাকি কুমির আর সাপ ছাড়ি দিবে। সামনে বানের পানি আসোছে, ওই পানির সাথে যদি জানোয়ারগুলা হামার এলাকাত ঢোকে, তামান ছাওয়া-পাউয়া নিয়া কোনটে যামো? ভয়ে এ্যালা নদীর কিনারাত মাছ ধরবারও যাছি না।’

বিপরীতমুখী ঝুঁকি
বাংলাদেশী পরিবেশবীদরা বিএসএফের পরিকল্পনাকে ‘পরিবেশগত যুদ্ধের হুমকি’ হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করেন, এমন পদক্ষেপ নিলে তা দক্ষিণ এশিয়ার জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। যদিও এখনও কোনো বার্তা না পাওয়ায় বিজিবি বিষয়টিকে ‘মনস্তাত্ত্বিক গুজব’ হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সাপ-কুমির বিচরণ অবৈধ বাণিজ্যের ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।

এ বিষয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও প্রখ্যাত নদী গবেষক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, যদি সীমান্ত পাহারার জন্য সাপ ও কুমির ব্যবহার করা হয়, তবে সেটি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করবে। এটি আন্তর্জাতিক নদী ও পরিবেশ আইনের চরম লঙ্ঘন। এই ধরনের পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ার জীববৈচিত্র্যের জন্য এক অশনিসংকেত।

লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এটি সম্পূর্ণ অকার্যকর এবং চরম অমানবিক কাজ। সাপের বিষ ও কুমিরের চামড়া অত্যন্ত মূল্যবান হওয়ায় এমন পদক্ষেপ নিলে উল্টো নতুন অবৈধ বাণিজ্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।