logo

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করলেন তাইজুল

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করলেন তাইজুল
মায়ের কাঁধে মাথা রেখে আছে এস এম তাইজুল ইসলাম। ছবি : এশিয়া পোস্ট

মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারানো, দারিদ্র্যের নিদারুণ কষ্টিপাথরে বড় হওয়া আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দুই কিডনি অকেজো হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো—সব অনিশ্চয়তা পেরিয়ে সিভিল জজ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন এস এম তাইজুল ইসলাম। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অর্জন করে নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং মায়ের ত্যাগের প্রতিদান দিয়েছেন তিনি।

বাবাকে হারিয়ে মায়ের আঁচলে বেড়ে ওঠা

মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার পূর্ব এনায়েতনগর ইউনিয়নের পূর্ব আলীপুর গ্রামের সন্তান তাইজুল ইসলাম। মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পর তিন সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব এসে পড়ে হাওয়া বেগমের ওপর। সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে। বিভিন্ন সময়ে নিজের ভাইদের কাছ থেকেও সহযোগিতা নিয়েছেন। কখনো না খেয়ে থেকেছেন, আবার কখনো নিজের প্রয়োজনের কথা ভুলে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন।

হাওয়া বেগম বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। কখনো এমনও হয়েছে, ছেলে-মেয়েদের মুখে খাবার দিতে পারিনি। আমার ভাইয়েরা তখন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। মাঠে কাজ করেছি, পরিশ্রম করেছি। আমার একটাই স্বপ্ন ছিল—আমার ছেলে একদিন জজ হবে।’

অভাবের মধ্যেও মেধার স্বাক্ষর

অভাবের সংসারে বেড়ে উঠলেও পড়াশোনায় মেধার স্বাক্ষর রাখেন তাইজুল। ২০০৮ সালে আলীপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় গোল্ডেন এ+ অর্জন করেন তিনি। মাদ্রাসাটির ইতিহাসে তিনিই প্রথম গোল্ডেন এ+ পাওয়া শিক্ষার্থী। এরপর ঢাকা কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন। ২০১০ সালের এইচএসসি পরীক্ষাতেও এ+ অর্জন করেন তিনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাক্রমে ৫৮তম স্থান অর্জন করে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।

২০১৫ সালে এলএলবি এবং ২০১৮ সালে এলএলএম সম্পন্ন করেন। তখন স্বপ্নের পথ অনেকটাই পরিষ্কার। কিন্তু এর মধ্যেই শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।

দুই কিডনি অকেজো, থমকে যায় স্বপ্ন

২০১৩ সাল থেকে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগতে শুরু করেন তাইজুল। প্রথমে কোমর ও পিঠে ব্যথা, পরে ২০১৫ সালে কিডনিতে সমস্যা ধরা পড়ে। একপর্যায়ে চিকিৎসকেরা জানান, তার দুই কিডনিই অকেজো হয়ে গেছে। শুরু হয় নিয়মিত ডায়ালাইসিস। বাড়তে থাকে চিকিৎসার খরচ। একসময় চিকিৎসকেরা কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন। এর জন্য প্রয়োজন ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। কিন্তু যে পরিবারের সংসার চালানোই কঠিন ছিল, তাদের কাছে এত অর্থ জোগাড় করা ছিল প্রায় অকল্পনীয়।

তাইজুল বলেন, ‘আমার দুটি কিডনি যখন ড্যামেজ হয়ে গেল, তখন লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। আমি তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষে। আমাদের ঘরে খাওয়ার মতো চালও থাকত না। এমন অবস্থায় ৩০ লাখ টাকা চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হলো। তখন মনে হয়েছিল, আমি হয়তো আর বাঁচব না, মায়ের স্বপ্নও পূরণ করতে পারব না।’

মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরাল মানুষের সহযোগিতা

তাইজুলের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়লে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, সহপাঠী, বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা পাশে দাঁড়ান। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেন। ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে নিজের জমিজমা ও যা কিছু ছিল, তা বিক্রি করারও চেষ্টা করেন হাওয়া বেগম। কিন্তু তাতেও প্রয়োজনীয় অর্থের ঘাটতি থেকে যায়। শেষ পর্যন্ত মানুষের সহযোগিতায় চিকিৎসার অর্থ জোগাড় হয়। ২০১৭ সালে ভারতে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় তাইজুলের।

পরিবারের সঙ্গে এস এম তাইজুল ইসলাম। ছবি : এশিয়া পোস্ট
পরিবারের সঙ্গে এস এম তাইজুল ইসলাম। ছবি : এশিয়া পোস্ট

হাওয়া বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে এমন রোগে পড়েছিল যে মনে হয়েছিল, তাকে আর বাঁচাতে পারব না। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আর মানুষের সহযোগিতায় সে ফিরে এসেছে। আমার ছেলে আজ জজ হয়েছে। আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আল্লাহর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’

‘একদিকে জীবন, অন্যদিকে স্বপ্ন’

অসুস্থতার সেই দিনগুলোর কথা মনে করে তাইজুল বলেন, ‘একদিকে আমার জীবন, অন্যদিকে আমার ক্যারিয়ার—সবকিছু শেষের দিকে চলে গিয়েছিল। তখন মনে হতো, আমি যদি মারা যাই, তাহলে কীভাবে জজ হব? এই চিন্তা আমাকে আরও ভেঙে দিত। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি।’ কিডনি প্রতিস্থাপনের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে আবার পড়াশোনায় ফেরেন তিনি। শারীরিক নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্বপ্নকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

তাইজুল বলেন, ‘আমি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ফিরেছি। আমার মা চেয়েছিলেন আমি জজ হই। বন্ধুবান্ধব, বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন—অনেকে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। তারা যদি সেদিন পাশে না দাঁড়াতেন, হয়তো আমি আজ এখানে থাকতাম না। আল্লাহর রহমতে আমি বেঁচে আছি এবং আজ জজ হতে পেরেছি। আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞ।’

অবশেষে পূরণ হলো মায়ের স্বপ্ন

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আসে সেই কাঙ্ক্ষিত সময়। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অর্জন করে সিভিল জাজ হিসেবে উত্তীর্ণ হন এস এম তাইজুল ইসলাম। যে মা একসময় ছেলের চিকিৎসার জন্য মানুষের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন, সেই মায়ের চোখে এখন আনন্দের অশ্রু।

তাইজুলের ভাই নাজমুল ও বোন খুরশিদা বলেন, ‘আমরা কখনো ভাবিনি ভাই আবার সুস্থ হয়ে সংসারের হাল ধরবে। এমন রোগ হয়েছিল যে সবাই ভেবেছিল, সে হয়তো আর বাঁচবে না। কিন্তু আল্লাহর রহমত আর মানুষের সহযোগিতায় ভাই বেঁচে ফিরেছে। আজ সে জজ হয়েছে, মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছে। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় আনন্দের।’

এদিকে তাইজুলের সাফল্যে আনন্দিত তার এলাকার মানুষও। তাদের ভাষ্য, একসময় যে ছেলেটিকে নিয়ে সবাই আশঙ্কায় ছিলেন, সেই ছেলেই আজ সাফল্যের মাধ্যমে এলাকার গর্ব হয়ে উঠেছে। আমরা ভেবেছিলাম তাইজুল আর বাঁচবে না। কিন্তু মানুষের সহযোগিতায় সে চিকিৎসা পেয়েছে, সুস্থ হয়েছে। আজ সে জজ হয়েছে। এটা শুধু তার পরিবারের নয়, আমাদের পুরো এলাকার জন্য আনন্দের বিষয়।