logo

আবাস হারাচ্ছে হরিণ, বাড়ছে নিধন

আবাস হারাচ্ছে হরিণ, বাড়ছে নিধন

খালের এক পাড়ে একটি মায়াবী চিত্রা হরিণের পা চেপে ধরে রয়েছেন এক ব্যক্তি। অন্য একজন দা দিয়ে কুপিয়ে হরিণটির গলা বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছেন। পাশে একটি কুকুর। কিছুটা দূরে আরেক ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

গত ১৩ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফুটেজের এই ঘটনা চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার উপকূলীয় এলাকার। এটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার পর জানা যায়, ওই এলাকায় এটি অনেকটা প্রতিদিনের ঘটনা।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে উপকূলীয় বন উজাড়ের কারণে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে হরিণসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণী। গত কয়েক বছরে আবাসন ও খাদ্য হারিয়ে এই অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ হরিণ বিলুপ্ত হয়েছে বলে আশঙ্কা করছে বন বিভাগ।

বন সংকুচিত হওয়ায় হরিণগুলো লোকালয়ে চলে এসে নিয়মিত শিকারি ও সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে; যা এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বা ইকো-সিস্টেমকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। মায়া হরিণ হত্যার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আবারও আলোচনায় এসেছে।

মিরসরাই উপকূলীয় বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ‘জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উপজেলার সাহেরখালী, ইছাখালী ও মঘাদিয়া ইউনিয়নের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২২ হাজার ৩৩৫ একর বনাঞ্চল বেজা কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করা হয়। এক সময়ের কেওড়া, গেওড়া ও বাইন গাছের এই নিবিড় বনাঞ্চলে ছিল হরিণ, শিয়াল, মেছোবাঘ, লজ্জাবতী বানর ও বিভিন্ন প্রজাতির সাপের নিরাপদ আবাস। তবে শিল্পনগরের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বনের সিংহভাগ ধ্বংস করায় এসব প্রাণী বিলুপ্তির পথে।

বন কর্মকর্তাদের তথ্য মতে, উপকূলীয় বনটিতে এক সময় ১০-১২ হাজার হরিণ ছিল। বর্তমানে এর মাত্র ২০ শতাংশ অবশিষ্ট থাকতে পারে। গত তিন বছরে বন বিভাগ আটটি হরিণ উদ্ধার করেছে, যার মধ্যে চারটি ছিল মৃত। ২০২২ সালের ৪ মার্চ মঘাদিয়া ঘোনা এলাকা থেকে শরীরে আঘাতের চিহ্নসহ দুটি মৃত হরিণ উদ্ধার করা হয়।

ধারণা করা হয়, বন হারিয়ে লোকালয়ে আসার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় এগুলো প্রাণ হারায়। ২০২৩ সালের ১২ মে শিল্পনগর এলাকা থেকে আরও একটি মৃত হরিণ উদ্ধার করা হয়। সবশেষ গত ১৫ এপ্রিল শিল্পনগরের সিপি মোড় এলাকার একটি পরিত্যক্ত পাইপ থেকে একটি হরিণশাবক জীবিত উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করা হয়েছে।

মিরসরাইয়ের বাসিন্দা ফাহিম আলম বলেন, ‘আগে এ বনে অসংখ্য হরিণ ও বন্যপ্রাণী ছিল। শিল্পনগরের কাজ শুরুর পর বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ায় এখন প্রাণীগুলোর আবাস্থল নষ্ট হয়েছে। আবাসস্থল না থাকায় হরিণগুলো অসহায় হয়ে পড়ছে। প্রায়ই লোকালয়ে চলে আসে এবং অনেকে এগুলো শিকার করে নিয়ে যাচ্ছে।

বাস্তুসংস্থান রক্ষায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নেওয়া বনাঞ্চলের মধ্য থেকে ৪ হাজার ১০৪ একর জমি ফেরত দিতে ২০২৪ সালে চিঠি দেয় বন মন্ত্রণালয়। এখন পর্যন্ত ওই জমি ফেরত পাওয়া যায়নি।

এর বাইরে বন রক্ষায় ‘সুফল’ প্রকল্পের আওতায় বামনসুন্দর ও মঘাদিয়া বিটে নতুন করে ম্যানগ্রোভ বাগান সৃজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০০ হেক্টর জমিতে প্রায় সাড়ে চার লাখ চারা রোপণ করা হয়। এছাড়া গত কয়েক বছরে প্রায় ৪১ লাখ চারা রোপণ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে উপকূলীয় বন বিভাগ। তবে নতুন করে সৃজন করা বাগানগুলো বন্যপ্রাণীর জন্য পূর্ণাঙ্গ আবাসে পরিণত হতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন।

মিরসরাই উপকূলীয় রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহেনশাহ নাওশাদ বলেন, গত ১৪ এপ্রিলের হরিণ হত্যার ঘটনায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে অজ্ঞাত তিন-চারজনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।