Advertisement

পাটের বাজারে বড় ধাক্কা, ১৫ দিনেই মণপ্রতি কমল হাজার টাকা

এশিয়া পোস্ট নিউজ, নড়াইল
পাটের বাজারে বড় ধাক্কা, ১৫ দিনেই মণপ্রতি কমল হাজার টাকা
পাটের বাজারে বড় ধাক্কা, ১৫ দিনেই মণপ্রতি কমল হাজার টাকা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পাটের মৌসুমে নড়াইলের কৃষকদের জন্য স্বস্তির বদলে দেখা দিয়েছে নতুন দুশ্চিন্তা। মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে জেলার বাজারে পাটের দাম মণপ্রতি প্রায় এক হাজার টাকা কমে গেছে। মৌসুমের শুরুতে যে পাট ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে, বর্তমানে মানভেদে তা ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকায় নেমে এসেছে। এতে উৎপাদন খরচ তুলে লাভ করা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন চাষিরা।

Advertisement

এর মধ্যে পাটের ওজন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের দাবি, প্রচলিত নিয়মে ৪০ কেজিতে এক মণ ধরা হলেও কোনো কোনো হাটে ৪২ কেজি পাটকে এক মণ হিসেবে হিসাব করা হচ্ছে। এতে বাজারদর কমার পাশাপাশি ওজনের ক্ষেত্রেও কৃষকদের অতিরিক্ত পাট দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নড়াইলে ২৩ হাজার ৫১৭ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এবার পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৮ হাজার ১৯৮ টন। এরই মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশ জমির পাট কাটা শেষ হয়েছে। ফলে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাট বাজারে আসায় সরবরাহ বেড়েছে।

জেলার অন্যতম বড় দুটি পাটের মোকাম তুলারামপুর ও মিঠাপুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই কৃষকেরা বিভিন্ন যানবাহনে করে পাট নিয়ে হাটে আসছেন। পাটের আঁশের রং, গুণগত মান, আর্দ্রতা ও শুকানোর অবস্থা দেখে দরদাম করছেন ফড়িয়া ও পাইকাররা। দর ঠিক হলে দ্রুত পাট কিনে তা গুদামে নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই পাট মজুত করে রাখার মতো আর্থিক অবস্থায় নেই। চাষের সময় নেওয়া ঋণ, সার-সেচের খরচ, শ্রমিকের পাওনা এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে দ্রুত পাট বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের। ফলে বাজারে দাম কম থাকলেও বাধ্য হয়ে পাট ছাড়তে হচ্ছে।

ইতনা এলাকার পাটচাষি আবদুল হালিম বলেন, মৌসুমের শুরুতে ভালো দামে পাট বিক্রি করা গেছে। এখন সেই পাটের দাম অনেক কমে গেছে। অথচ সার, শ্রমিক, সেচ ও পরিবহনের খরচ কমেনি। দাম আরও কমলে চাষের খরচই উঠবে না।

আরেক কৃষক বলেন, পাট ঘরে রেখে দেওয়ার সামর্থ্য অনেকের নেই। বিভিন্ন জায়গায় টাকা দিতে হবে, তাই কম দাম হলেও পাট বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজারে সরবরাহ বাড়ার সুযোগ নিয়ে যদি দাম আরও কমানো হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কৃষকেরাই।

তুলারামপুর ও মিঠাপুর হাটের কয়েকজন পাইকারি ব্যবসায়ী জানান, মৌসুমের শুরুতে বাজারে পাটের সরবরাহ কম ছিল। একই সময়ে পাটকলগুলোর চাহিদা থাকায় দামও তুলনামূলক বেশি ছিল। এখন জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাট কাটা ও বাজারজাত একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। এর প্রভাবেই মূলত দাম কমেছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, সামনে বাজারে পাটের সরবরাহ আরও বাড়তে পারে। তবে পাটকলের চাহিদা, অভ্যন্তরীণ বাজার এবং পাটজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক চাহিদার ওপরও দাম নির্ভর করবে। তাই ভবিষ্যতে দাম কোন দিকে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

এদিকে ওজন নিয়ে কৃষকদের অভিযোগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তাদের দাবি, ৪০ কেজিতে এক মণ হিসাব করার বদলে কোথাও কোথাও ৪২ কেজিতে এক মণ ধরা হচ্ছে। এতে প্রতি মণে প্রায় দুই কেজি অতিরিক্ত পাট দিতে হচ্ছে। ফলে কাগজে যে দর পাওয়া যাচ্ছে, প্রকৃত হিসাবে কৃষকের প্রাপ্ত মূল্য তার চেয়েও কমে যাচ্ছে।

তবে ৪০ কেজির পরিবর্তে ৪২ কেজিতে পাট মাপার অভিযোগের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। কৃষকদের দাবি, বিষয়টি সরেজমিনে যাচাই করে সঠিক ওজন নিশ্চিত করা হোক।

কৃষকেরা আরও জানান, পাট উৎপাদনে জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে বীজ, সার, সেচ, আগাছা দমন, কর্তন, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া, শুকানো ও পরিবহন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই খরচ রয়েছে। বিশেষ করে শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় বেড়েছে। বর্তমান বাজারদরে কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি তাদের।

কৃষকদের একটি অংশের অভিযোগ, সরবরাহ বাড়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা ব্যবসায়ী বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি করছেন। তবে ব্যবসায়ীরা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেড়ে যাওয়াই দাম কমার প্রধান কারণ।

কৃষকদের দাবি, পাটের বাজারে নিয়মিত তদারকি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সঠিক মাপজোক নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে কোনো ধরনের কারসাজি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

নড়াইলের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আব্দুল সালাম বলেন, পাটের বাজার পরিস্থিতি প্রশাসনের নজরদারিতে রয়েছে। কোনো সিন্ডিকেট বা কারসাজির কারণে যাতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়ে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। মাপজোক নিয়ে কৃষকদের অভিযোগও যাচাই করে দেখা হবে। কোনো অনিয়ম বা কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে নড়াইলে পাটের আবাদ ও উৎপাদন উল্লেখযোগ্য। অধিকাংশ জমির পাট কাটা শেষ হওয়ায় এখন বাজারে সরবরাহ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষকের উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষকদের প্রত্যাশা, বাজারে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা বজায় রাখার পাশাপাশি সঠিক ওজন ও ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বিষয় :