logo

মাটিবিহীন কোকোপিট ও প্লাস্টিক ট্রেতে সবজি চাষ করে তাক লাগিয়েছেন ফরিদ

আবু সালেহ মো. রায়হান
পঞ্চগড়
মাটিবিহীন কোকোপিট ও প্লাস্টিক ট্রেতে সবজি চাষ করে তাক লাগিয়েছেন ফরিদ
মাটিবিহীন আধুনিক প্রযুক্তি কোকোপিট ও প্লাস্টিক ট্রের সমন্বয়ে উৎপাদিত সবজির চারার যত্নে ব্যস্ত কৃষি উদ্যোক্তা ফরিদ হোসেন। ছবি : এশিয়া পোস্ট

মাটিবিহীন আধুনিক প্রযুক্তি কোকোপিট ও প্লাস্টিক ট্রের সমন্বয়ে বিষমুক্ত ও সুস্থ-সবল চারা উৎপাদন করে এলাকায় রীতিমতো সাড়া ফেলেছেন পঞ্চগড়ের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা ফরিদ হোসেন। পুঁজি হারিয়েও হার না মানা অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগে গড়ে তুলেছেন ‘তেপুকুরিয়া ফারমার্স হাব’। বর্তমানে চারটি ইউনিটের সমন্বয়ে গঠিত এই হাব থেকে মাসে আয় করছেন লক্ষাধিক টাকা, যার মাধ্যমে তৈরি হয়েছে স্থানীয় অন্তত ১৫ জনের কর্মসংস্থান।

প্রতিকূলতা পেরিয়ে স্বপ্নের সূচনা

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার বেংহারী বনগ্রাম ইউনিয়নের তেপুকুরিয়া কুমিল্লাপাড়া গ্রামের কৃষক পরিবারের সন্তান ফরিদ হোসেন। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় ফরিদ ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। নিজেদের জমিতে চাষাবাদের জন্য বাইরে থেকে চারা কিনে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, ২০২১ সালে ৮০০ টাকা বিনিয়োগে পরীক্ষামূলকভাবে দুইটি বেডে চারা উৎপাদন শুরু করেন।

অভিজ্ঞতাহীনতার কারণে শুরুতে চারা মরে যাওয়া ও বিক্রি না হওয়ায় মূলধন হারিয়ে চরম সংকটে পড়েন তিনি। বাধ্য হয়ে একটি এনজিওতে চাকরি নিলেও তা ছেড়ে দেন দুই মাস পর। পরবর্তীতে সেখান থেকে ঋণ নিয়ে পুনরায় নতুন উদ্যমে গড়ে তোলেন ‘তেপুকুরিয়া ফারমার্স হাব’।

শুরুতে দূরবর্তী জেলা থেকে কোকোপিট আনলেও বর্তমানে ফরিদ নিজেই তা তৈরি করছেন। পলি শেড ও বিশেষ ইনসেক্ট নেটের সুরক্ষিত অবকাঠামো ব্যবহার করে ক্ষতিকর পোকামাকড় ও সরাসরি সূর্যের আলো থেকে চারা রক্ষা করা হচ্ছে। বর্তমানে ৬০ শতাংশ লিজ নেওয়া জমিতে ১০ হাজার ট্রের মাধ্যমে একযোগে লক্ষাধিক চারা উৎপাদিত হচ্ছে।

হাবে দেশি-বিদেশি নামি ব্র্যান্ডের বীজ ব্যবহার করে পেঁপে, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, শিম, টমেটো, বেগুন, ফুলকপি ও বাঁধাকপিসহ নানা সবজির বিষমুক্ত চারা তৈরি করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি তিনি পরিবেশবান্ধব কেঁচো কম্পোস্ট (ভার্মিকম্পোস্ট) সারও উৎপাদন করছেন।

বর্তমানে তিনি ৬০ শতাংশ জমি লিজ নিয়ে চারটি ইউনিটে ১০ হাজার ট্রেতে তিনি একসঙ্গে লক্ষাধিক চারা উৎপাদন করছেন। পোকামাকড়ের আক্রমণ ঠেকাতে পুরো অবকাঠামো ঘিরে রাখা হয়েছে বিশেষ ইনসেক্ট নেট বা সুরক্ষাজাল দিয়ে। এতে সরাসরি সূর্যের আলো মাটিতে পড়তে বাধা দেয়। চারা ঢেকে রাখেন পলিশেড দিয়ে।

নার্সারিতে আধুনিক ট্রেই পদ্ধতিতে চারা তোলা ও বাছাইয়ের কাজে ব্যস্ত দুই কৃষি শ্রমিক। ছবি : এশিয়া পোস্ট
নার্সারিতে আধুনিক ট্রেই পদ্ধতিতে চারা তোলা ও বাছাইয়ের কাজে ব্যস্ত দুই কৃষি শ্রমিক। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ফরিদ হোসেনের এই ফারমার্স হাবে উৎপাদিত চারার মধ্যে রয়েছে পেঁপে, টমেটো, বেগুন, লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপিসহ বিভিন্ন সবজি। কাজ করছেন নারী-পুরুষসহ ১৫ জন শ্রমিক। কেউ কোকোপিট প্লাস্টিকের ট্রেতে ভরছেন। আবার কেউ চারার বীজ ট্রেতে বসাচ্ছেন। শ্রমিকেরা চাষীদের চাহিদামতো সবজির চারা সরবরাহ করছেন। আবার চারার পরিচর্যাতেও ব্যস্ত সময় পার করছেন।

অর্থনৈতিক সাফল্য ও কর্মসংস্থান

চারা উৎপাদন ও শ্রমিকদের মজুরিসহ মাসে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ব্যয় হলেও কেঁচো কম্পোস্ট ও চারা বিক্রি থেকে সব ব্যয় শেষে লক্ষাধিক টাকা নিট মুনাফা পান ফরিদ। এ ছাড়াও স্থানীয় বাজারে একটি সার ও কীটনাশকের দোকান পরিচালনা করে মাসে তার আয় লক্ষাধিক টাকা।

ফরিদের এই উদ্যোগ স্থানীয়দের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এখানে কাজ করে নিজেদের সংসার চালানো ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাচ্ছেন নারী-পুরুষসহ নানা বয়সি শ্রমিকেরা। ট্রেতে কোকোপিট ভরা ও বীজ রোপণের কাজ করে নারীরা দৈনিক ৩০০-৪০০ টাকা আয় করছেন। অন্যদিকে পুরুষ শ্রমিকদের দৈনিক হাজিরা ৫০০ টাকা। স্থানীয় শ্রমিকদের মতে, এই হাবের কারণে তারা বারো মাস কাজের সুযোগ পাচ্ছেন এবং সংসারের আর্থিক চাহিদা মেটাতে পারছেন।

সোহাগ ইসলাম নামে এক শ্রমিক বলেন, আমি প্রথমে বাসায় বেকার বসে থাকতাম। ফরিদ ভাই ফারমার্স হাব করায় এখন এখানে বারোমাস কাজ করি, ৫০০ টাকা হাজিরা পাই। তা দিয়ে সংসার চালানো, সন্তানের পড়াশোনা করানো সবই করতে পারি।

ঝরনা বেগম নামে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী শ্রমিক বলেন, আমরা বাড়ির কাজের পাশাপাশি ফরিদ ভাইয়ের এখানে কাজ করছি। এখান থেকে যা আয় করি তা বাড়তি উপার্জন। নিজের হাত খরচ, সংসারে সহযোগিতাসহ সন্তানের পড়াশোনাতে এই টাকা খরচ করি। অনেক সময় ফরিদ ভাইয়ের কাছে অনেক টাকা জমা হয়ে থাকে। সেই টাকা আমরা পর্যায়ক্রমে নিয়ে খরচ করতে পারি।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মিলছে ফরিদ চারা

মানসম্মত ও সুসংগঠিত পরিবহন ব্যবস্থার কারণে ফরিদ হোসেনের উৎপাদিত চারার চাহিদা এখন নিজ জেলা ছাড়িয়ে পৌঁছে যাচ্ছে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও রাজশাহীর মতো দূরবর্তী জেলাগুলোতে। চাষীদের সুবিধার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে ইজিবাইকে করে সরাসরি ক্ষেতে চারা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

স্থানীয় চাষি কামাল হোসেন জানান, আগে এই হাব থেকে বেগুনের চারা কিনে মাত্র ৪০ হাজার টাকা খরচে দেড় লাখ টাকার বেগুন বিক্রি করেছি। এখানে পাওয়া মানসম্মত চারা ব্যবহারের ফলে ফসলের ফলন ভালো হয় এবং বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন সহজ হয়। আজও দুইশত বেগুনের চারা কিনলাম।

বেংহারী বনগ্রাম ইউনিয়নের ফুলতলা এলাকার চাষি আব্দুল মজিদ বলেন, আমি নিজের খাবার জন্য সবজির উৎপাদন করলেও এই হাবের চারা ব্যবহার করি। ফরিদ ভাই কোকোপিটসহ নানা জৈব উপায়ে চারা উৎপাদন করায় চারার মান ভালো থাকে। যে কারণে বিষ ব্যবহার তেমন করতে হয় না। আমি সবসময় এখান থেকে চারা কিনি।

সরকারি সহযোগিতার প্রত্যাশা

কৃষি উদ্যোক্তা ফরিদ হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ছোট থেকেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছি। নিজেদের জমিতে বাবাসহ সবজির চাষ করতাম। সেসময় চারা বাইরে থেকে কিনে আনতে হতো। তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতাম। পরে নিজেই সবজির চারা উৎপাদনের শুরু করি। শুরুতে মূলধন হারানোয় আমার স্ত্রী আমাকে বলে তুমি আর এসবে যেও না। অনেক লোকসান করেছ। তবুও আমি হাল ছাড়িনি।

সফল এই অগ্রযাত্রায় কৃষি বিভাগের কাছ থেকে আশানুরূপ সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন এই কৃষি উদ্যোক্তা। ফরিদ হোসেন বলেন, কৃষি বিভাগকে পাশে না পেলেও বর্তমানে নিজেই মানসম্মত চারা উৎপাদন করছি। আমার চারার চাহিদা প্রচুর। নিজের বেকারত্ব দূর হয়েছে। গ্রামের বাজারে একটি সার ও কীটনাশকের দোকান দিয়েছি। বর্তমানে আমি পরিবার নিয়ে সুখে আছি।

তবে এ বিষয়ে বোদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আহমেদ রাশেদ উন নবী এশিয়া পোস্টকে জানান, মাঠ পর্যায়ে সব ধরনের কৃষককে পর্যায়ক্রমে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তবে কৃষকের যে অভিযোগ তা আসলে দূরত্ব সৃষ্টির জন্য হয়েছে। আমরা সব সময় কৃষকদের কারিগরি সহযোগিতা করে থাকি। তবে তিনি যদি কোনো কৃষি উপকরণের জন্য আমাদের কাছে আবেদন করেন তাহলে আমরা অবশ্যই বরাদ্দ থাকা সাপেক্ষে সরবরাহ করবো।