logo

আগাম বন্যার আগেই বৃষ্টিতে তলিয়ে গেল হাওরের ধান

আগাম বন্যার আগেই বৃষ্টিতে তলিয়ে গেল হাওরের ধান

আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে আগাম বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ভারী বৃষ্টিতে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে ও আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছিল।

আগাম বন্যার শঙ্কায় দ্রুত হাওরের পাকা ধান কেটে তোলার অনুরোধও জানায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি বিভাগ। কিন্তু সুরমা, কুশিয়ারা, বৌলাই, রক্তি, জাদুকাটা, সুমেশ্বরীসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার আগেই ভারী বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে হাওরের পাকা ধান।

গত দুই দিনে সদর উপজেলার দেখার হাওর, খরচার হাওর, জামালগঞ্জ উপজেলার হালীর হাওর, পাগনার হাওর, দিরাই ও শাল্লা উপজেলার কালীয়াকোটা হাওর, বরাম হাওর, ছায়ার হাওর, তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওর, মাটিয়ান হাওরসহ আরও বেশকিছু হাওরের পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। 

জানা গেছে, গত দুই দিন ধরে সুনামগঞ্জে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। সোমবার (২৭ এপ্রিল) সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। একইসঙ্গে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পানি নামছে। সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি ৩৫ সেন্টিমিটার বেড়েছে। মঙ্গলবার সকালে বিপৎসীমার ২.১৯ মিটার (৭.১৮ফুট) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সকল নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধে পানির চাপ বাড়ছে। 

মঙ্গলবার সকালে মধ্যনগর উপজেলার ইকরছড়ি (এরনবিল) হাওরের জামখলা খালের বাঁধ ভেঙে কিছু বোরো জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের হামিদপুর গ্রামের পশ্চিমে সুমেশ্বরী নদীর শাখা নদী মনাই নদীর পানির চাপে এরনবিলের জামগড়া খালের এই বাঁধটি ভেঙে যায়। 

স্থানীয় কৃষকদের দাবি, এই বাঁধের ভেতরে ইকরছড়ি (এরনবিল) হাওরে এলাকার হামিদপুর, চান্দালিপাড়া, চাঁনপুর, গড়াকাটা, হরিনাকান্দী, তেলিগাঁও, বাগারপাড়া গ্রামের কৃষকরা প্রায় ২০০ একর বোরো চাষ করেছেন। ইতোমধ্যে হাওরে অর্ধেক জমির ধান কাটা হয়েছে। হঠাৎ করে খালের বাঁধটি ভেঙে যাওয়ায় বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। 

বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. কামাল মিয়া বলেন, এরনবিল হাওরের জামখলা খালে বাঁধটি আমরা স্থানীয় লোকজন নিয়ে দিয়ে থাকি। বিলের ভেতরে ৬-৭টি গ্রামের মানুষ ধান চাষ করেন। অনেকেই ধান কেটে নিয়েছেন, আবার কিছু কৃষকের ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।

মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সঞ্জয় ঘোষ অবশ্য বলেছেন, এটি বোরো ফসলরক্ষার কোনো বাঁধ নয়, ইকরছড়ি বিলের খালের ওপরে দেওয়া একটি গ্রামীণ মাটির রাস্তা। নেত্রকোনার দুর্গাপুর এলাকার পাহাড়ি ঢলের পানির চাপে এটি ভেঙে গেছে। যেখানে পানি ঢুকছে, সেটি প্রকৃতপক্ষে জলমহাল। জলমহালের তীরে ১১৪ হেক্টর জমি চাষাবাদ করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে ৫০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। পানিতে হয়তো ৫-১০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যেতে পারে। 

কৃষকরা জানিয়েছেন, গত দুই দিনের ভারী বৃষ্টিতে সদর, জামালগঞ্জ, দিরাই, শাল্লা, তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার অনেক হাওরে পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। বৈরী আবহাওয়া, ধানের জমিতে পানি জমে জলাবদ্ধতার কারণে ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে পানির কারণে কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

তবে জেলা কৃষি বিভাগের দাবি, সোমবার জেলার হাওরে ১ লাখ ৬৫ হাজার২৭৫ হেক্টর জমির মধ্যে ৯২ হাজার ৮৮৭ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, যা ৫৬ দশমিক ২০১ ভাগ। হাওর ছাড়া উঁচু এলাকায় ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমির মধ্যে ৬ হাজার ৫৯৬ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, যা ১১ দশমিক ৩২৭ ভাগ। গড়ে জেলায় ৪৪ দশমিক ৫০৯ ভাগ জমির ধান কাটা হয়েছে।

জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে শিলাবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় প্রথম তিন ধাপে ২০৪৭ হেক্টর এবং নতুন করে বৃষ্টিপাতের কারণে আরও ১২০৭ হেক্টরসহ মোট ৩ হাজার ২৫৮ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

তবে জেলা কৃষি বিভাগের এই ক্ষয়ক্ষতির তথ্য মানতে নারাজ স্থানীয় কৃষক এবং হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের দায়িত্বশীলরা। তাদের দাবি, মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারী বৃষ্টি হওয়ায় প্রতিদিনই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। 

হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি রাজু আহমদ বলেন, নদী খনন না করে শুধু বাঁধ দিয়ে হাওরের বোরো ফসলরক্ষা করতে গিয়ে হাওরের বারোটা বাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের ধারণা, শিলাবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বাঁধ ভেঙে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে জেলার প্রায় সাতটি উপজেলায় হাওরের পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি অনুযায়ী ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। কৃষদের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কৃষি বিভাগ ও প্রশাসন কোনো সময়ই সঠিক তথ্য প্রকাশ করে না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরের ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ টন। যার বাজারমূল্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা। শ্রমিকদের পাশপাশি জেলায় ধান কাটার যন্ত্র হিসেবে ৬০২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ১৪৬টি রিপার রয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে আরও ২১০টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার এনেছেন কৃষকেরা। 

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জে হাওরের বোরো ফসলরক্ষায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার মাটির ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করেছে। এসব কাজ বাস্তবায়ন করেছে কৃষকদের দিয়ে গঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি)।

সদর উপজেলার হালুয়ারগাঁও গ্রামের কৃষক রইছ মিয়া বলেন, ‘এবার ১৮ কিয়ার (৩০ শতাংশ জমিতে ১ কিয়ার) ক্ষেত করেছি, দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ঋণ আছে অনেক টাকা, কিন্তু ধান কাটছি মাত্র তিন কিয়ার জমির। ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যায় না, মেঘের পানিতে ক্ষেত তলিয়ে যাচ্ছে। যে ধান কাটছি, সেগুলোও শুকানো যাচ্ছে না, আমরা বাঁচব কী করে?’

জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরপাড়ের হটামারা গ্রামের প্রবীণ কৃষক আব্দুল হেকিম বলেন, ৩৬ কিয়ার জমির মধ্যে আট কিয়ার জমির ধান কেটেছি। বৃষ্টির পানিতে ছাগাইয়া হাওরের বাঁধ ভেঙে পাকা ধান তলিয়ে যাচ্ছে। ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যায় না। হাওরের মাত্র ৩০-৪০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে, বাকি ধান পানির নিচে যাচ্ছে।

শাল্লা উপজেলার আটগাঁও গ্রামের কৃষক অলিউর রহমান চৌধুরী ইমন বলেন, হাওরের পানি নিষ্কাশনের কোনো পথ না থাকায় কয়েক দিনের বৃষ্টির পানিতে কালীয়াকোটা হাওরের পশ্চিম অংশের অধিকাংশ বোরো ধান তলিয়ে গেছে। ঠান্ডা পানিতে শ্রমিকরা হাওরে ধান কাটতে চায় না। হাওরের পাকা ধান নিয়ে কৃষকরা চরম সংকটে পড়েছেন।

তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরপাড়ের পাকাবুকা গ্রামের কৃষক রিপচান হাবিব বলেন, ২৩ কিয়ার জমি করেছিলাম। এর মধ্যে বৃষ্টির পানিতে মাটিয়ান হাওরে আট কিয়ার জমির ধান ডুবে গেছে। ১০০ মণ ধান পড়ে আছে, বৃষ্টির কারণে শুকানো যাচ্ছে না। হাওরে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকাতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছি আমরা।

হাওরের কৃষি ও কৃষকরক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, বৈজ্ঞানিক কোনো সমীক্ষা ছাড়াই হাওরে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ দেওয়া হয়। এবারের অবস্থা বিবেচনা করে হাওরে প্রকৃত ফসলরক্ষা বাঁধ দিতে হবে। গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, হাওরের বিল ও নদী খনন করলে এই অবস্থার সৃষ্টি হবে না। বিল খনন করলে হাওরে পানির ধারণক্ষমতা বাড়বে, নদী খনন করলে পানি প্রবাহ বাড়বে এবং বন্যার ঝুঁকি হ্রাস পাবে। 

তিনি বলেন, কিন্তু এসব না করে প্রতি বছরই শুধু বাঁধ দেওয়া হয়। এই বছরে হাওরে গড়ে ৩০-৪০ ভাগ ধান পাবেন কৃষকরা। কারণ, বৃষ্টির পানিতে ধান অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকরা পানির নিচ থেকে ধান তুলতে পারলেও সময়মতো শুকাতে না পারার কারণে ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। 

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি হতে পারে। ইতোমধ্যে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। যদি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকে, তাহলে আগাম বন্যার আশঙ্কা আছে। ফসলরক্ষা বাঁধগুলো এখন সুরক্ষিত আছে, তবে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, জেলার সব হাওরেই শ্রমিকদের পাশাপাশি কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা চলছে। যে জমিতে ৮০ ভাগ পাকা ধান রয়েছে, সেগুলো দ্রুত কাটার জন্য কৃষকদের অনুরোধ করছি। বন্যার পূর্বাভাস অনুযায়ী দ্রুত ধান কাটার জন্য আমরা স্থানীয় কৃষকদের উদ্ভুদ্ধ করছি। প্রকৃতি বৈরী আচরণ করছে, কৃষকরা দিনে-রাতে কাজ করে হাওর থেকে ধান তোলার চেষ্টা করছেন। আগে শিলাবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ফসলের কিছু ক্ষতি হয়েছিল। এখন প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে, ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলের পানিতে সুনামগঞ্জের হাওর ও নদীতে পানি বাড়ছে। এতে হাওরের বিভিন্ন ফসলরক্ষা বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তাই সব বাঁধে পাহারার ব্যবস্থা করার জন্য বাঁধ নির্মাণের দায়িত্বে থাকা সব প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) লোকজনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাওরের বোরো ফসল কাটা ও ফসলরক্ষা বাঁধের বিষয়ে সার্বক্ষণিক মনিটিরং করা হচ্ছে, নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়েছে। হাওরের পাকা ধান দ্রুত কেটে তোলার জন্য কৃষকদের অনুরোধ করা হচ্ছে।