logo
Advertisement

সন্তানদের অবহেলা/জীবিত থাকতেই কবর তৈরি করে রাখলেন বৃদ্ধা

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজঠাকুরগাঁও
জীবিত থাকতেই কবর তৈরি করে রাখলেন বৃদ্ধা
আয়েশা খাতুন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

জীবনের শেষপ্রান্তে এসে অধিকাংশ মা-বাবার একমাত্র ভরসা তাদের সন্তানরা। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা সব সময় সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটায় না। মৃত্যুর পর সন্তানরা যথাযথভাবে দাফন করবেন কি না—এমন অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা থেকে জীবিত থাকতেই নিজের কবর খুঁড়ে প্রস্তুত করে রেখেছেন এক বৃদ্ধা মা।

ঘটনাটি ঘটেছে ঠাকুরগাঁওয়ের ভুল্লী উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের বড়বালিয়া পাইকারমনি গ্রামে। ওই বৃদ্ধার নাম আয়েশা খাতুন, যিনি এলাকার মৃত আয়নাল হকের স্ত্রী।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, স্বামীর মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ধরে সন্তানদের অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই দিন কাটছে এই বৃদ্ধার। অভিযোগ রয়েছে, দুই ছেলে মায়ের সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর থেকে আর কোনো খোঁজখবর রাখেন না। বড় ও ছোট ছেলের বাড়িতে কিছুদিন থাকার পর বনিবনা না হওয়ায় তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহায়তায় স্বামীর রেখে যাওয়া আড়াই শতাংশ জমির ওপর মাথা গোঁজার ঠাঁই পান বৃদ্ধা আয়েশা খাতুন। কিন্তু ছেলেদের ওপর কোনো ভরসা না থাকায় নিজ ঘরের পাশেই খুড়ে রেখেছেন নিজের কবর। প্রতিদিন সেই কবরের পাশ দিয়েই হেঁটে যান তিনি, আর নীরবে অপেক্ষা করেন জীবনের শেষ প্রহরটির।

স্থানীয় বাসিন্দা আজগড় আলী আফসোস করে বলেন, তার দুটি ছেলেসন্তান রয়েছে। বাবা জমিজমা রেখে গেছেন, এমনকি মায়েরও যে জমি ছিল তাও তারা লিখে নিয়েছে। অথচ জমি নেওয়ার পর মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। বাধ্য হয়ে তিনি নিজের কবর নিজে খুঁড়ে রেখেছেন এবং আমাদের গ্রামবাসীদের বলে রেখেছেন মৃত্যুর পর আমরা যেন তাঁর দাফনের ব্যবস্থা করি। একজন মায়ের জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া পুরো সমাজের জন্যই লজ্জাজনক।

আরেক বাসিন্দা বেলাল হোসেন বলেন, যে মা সারা জীবন সন্তানকে মানুষ করতে নিজের সবকিছু উৎসর্গ করেন, শেষ বয়সে সেই মাকেই নিজের দাফনের ব্যবস্থা করে রাখতে হচ্ছে—এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না। সন্তান না থাকলে তাও একটা কথা ছিল, কিন্তু দুই ছেলে থাকা সত্ত্বেও এ দৃশ্য আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়কে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

জমেলা আক্তার নামের স্থানীয় এক নারী বলেন, দীর্ঘ ৫ বছর ধরে আয়েশা খাতুন এখানে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। জমি লিখে নেওয়ার পর ছেলেরা আর তার কোনো খোঁজ নেয় না। তার ছেলেরা ভালো ব্যবসা-বাণিজ্য করে, অথচ মায়ের কোনো দায়ভার নেয় না। আমরা প্রতিবেশীরা কিছু বলতে গেলে উল্টো আমাদের গালিগালাজ করে।

নিজের করুণ আকুতি প্রকাশ করে বৃদ্ধা আয়েশা খাতুন বলেন, পাঁচ বছর আগে আমার নামে থাকা জমিটুকু ছেলেরা লিখে নেয়। এর পর থেকেই শুরু হয় আমার ওপর অত্যাচার। ঠিকমতো খেতে দিত না। বড় ছেলে বলে ছোট ছেলের ওখানে খা, আর ছোট ছেলে বলত বড় ভাই খাওয়াবে। এত অবহেলা সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে বাড়ি ছেড়ে চলে আসি। পরে এলাকাবাসী আমার স্বামীর রেখে যাওয়া অল্প জমিতে খড়ের একটি ঘর বানিয়ে দেন। ৫ বছর ধরে একাই এই ভাঙা ঘরে বাস করছি। ঘরে বিদ্যুৎ নেই, বৃষ্টি হলে পানি পড়ে, এমনকি না খেয়েও দিন কাটে। কত কষ্ট করে সন্তানদের বড় করলাম, অথচ আজ কেউ দেখতেও আসে না। তাই নিজের কবর নিজেই বানিয়েছি। এলাকাবাসীকে বলে রেখেছি, মৃত্যুর পর তারা যেন আমাকে দাফন করে। আমার সন্তানরা যেন আমার জানাজায় না আসে।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে বৃদ্ধা আয়েশা খাতুনের ছেলেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা এ নিয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে বালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ভুট্টু চৌধুরী বলেন, ঘটনাটি আমার ইউনিয়নের। বৃদ্ধা মায়ের এই তৈরি করে রাখা কবর যেন আমাদের পুরো সমাজকে একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমরা কি সত্যিই আমাদের মা-বাবার প্রতি সঠিক দায়িত্ব পালন করছি? আমি ব্যক্তিগতভাবে ছেলেগুলোর সঙ্গে কথা বলে দ্রুত একটি সমাধান করার চেষ্টা করব।