৮ বছরেও শেষ হয়নি প্রকল্প/সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজে অচলাবস্থা

বিন্দু তালুকদার, সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজে অচলাবস্থা
সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পাঠদান শুরুর পাঁচ বছরেও জনবল ও অবকাঠামোগত পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। দীর্ঘ সময় কলেজে পাঠদান চলমান থাকলেও স্থায়ী হাসপাতাল নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন শিক্ষার্থীরা। উদ্ভূত পরিস্থিতে গত বছর আন্দোলনে নেমেছিলেন তারা। কোনো ধরনের সমাধান না পেয়ে দ্বিতীয় দফায় শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে সড়কে অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রেখে ২১ জুন থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

Advertisement

কলেজের একাডেমিক ভবনে তালা দিয়ে অষ্টম দিনের মতো সোমবার (২৯ জুন) দুপুরে সুনামগঞ্জ শহরের আলফাত স্কয়ার মোড়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। প্রায় সাড়ে তিনশ শিক্ষার্থীর সঙ্গে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সংহতি প্রকাশ করে কর্মসূচিতে অংশ নেন।

নিজেদের অনিশ্চয়তায় থাকার কথা জানিয়ে কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম সাকিব বলেন, ‘ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। আমাদেরকে আন্দোলন করতে হচ্ছে। শিক্ষক শূন্যতার কারণে আমাদের আগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের সিলেবাসের অনেক কিছুই পড়ানো হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘সেপ্টেম্বরে পরীক্ষায় বসতে হবে। অন্যান্য মেডিকেলে প্রতিদিন তিনটি ক্লাস হয়, আমাদের হয় একটি। অন্য মেডিকেলে শিক্ষার্থীরা দুইবার ওয়ার্ড করে, আমরা একবার করি। সুনামগঞ্জ সদরের হাসপাতালে আসতে যেতে সময় চলে যায়। ডাক্তার হতে এসে সংকট নিরসনে আন্দোলন করতে হচ্ছে।’

সাইদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘হাসপাতাল চালুসহ আমাদের দাবি নিয়ে রোডম্যাপ ঘোষণা না হলে আমরা ক্লাসে ফিরে যাব না। প্রিন্সিপাল স্যার মন্ত্রণালয় ও আমাদের সঙ্গে কথা বলছেন। আগামী পরশু দিন একটি আলোচনা হতে পারে। ক্লাস বর্জন কর্মসূচি চালিয়ে যাব। ক্লাসে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই আমাদের। আমাদের সঙ্গে সুনামগঞ্জের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ সংহতি প্রকাশ করেছেন।’

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

একই বর্ষের শিক্ষার্থী পৃথ্বীরাজ চৌধুরী বললেন, ‘হাসপাতাল চালু না হওয়ায় ক্লিনিক্যাল ক্লাস না হলে আমরা ডাক্তার হবো কীভাবে। কলেজে অনেক বিষয়ের শিক্ষকের পদ শূন্য। এভাবে থাকলে আমরা কীভাবে ডাক্তার হবো। গত বছর আন্দোলনের পর দুটি বাসের ব্যবস্থা হয়েছে। বাসে করে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল ক্লাসে যেতে হয়। তিন ব্যাচের ১৭৫ জন শিক্ষার্থী দুইটি বাসে যাই, কিন্তু সদর হাসপাতালেও ডাক্তার সংকটের কারণে শেখানোর কেউ থাকেন না।’

প্রকল্প শেষ হয়নি ৮ বছরে

সুনামগঞ্জে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয় আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। ২০১৮ সালে এ সংক্রান্ত প্রকল্প (বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল) নেয় তৎকালীন সরকার। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্যাম্পাস স্থাপনের জন্য সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মদনপুর গ্রামে ভূমি অধিগ্রহণ শুরু করে সুনামগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগ। ২০২০ সালের মার্চে সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে ৩৫ একর জমি কেনা হয় ২৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে।

একই বছর শুরু হয় কলেজ ও হাসপাতাল ভবন নির্মাণকাজ। নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ১১০৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। কয়েক দফা বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। সময় পার হওয়ায় আরও দুই বছর কাজের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ২০টি ভবন পাবে এই মেডিকেল কলেজ।

স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের মধ্যে ২০২১ সালে শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে কলেজের পাঠদান শুরু হয়। কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৪ সালে। তবে প্রকল্প নেওয়ার আট বছরেও প্রাসঙ্গিক ভবন নির্মাণ ও হাসপাতাল চালু না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোল্লা রবিউল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, সব ভবনের কাজ শেষ। অক্সিজেন প্লান্টের কাজ চলমান রয়েছে। অক্সিজেন প্লান্ট ও গ্যাসের লাইনের কাজ এক মাসের মধ্যে শেষ হবে। শুধুমাত্র অডিটোরিয়ামের কাজ চলমান রয়েছে। অডিটোরিয়াম ছাড়া অন্য সব ভবন হস্তান্তর করা যাবে।

সংসদে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ

হাসপাতাল চালুসহ নানা দাবিতে গত বছরের এপ্রিল মাসে আন্দোলন করছিলেন শিক্ষার্থীরা। তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে তারা শ্রেণিকক্ষে ফিরে যায়। দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এক বছরের মাথায় দ্বিতীয় দফায় আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়টি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের দৃষ্টিতে আনেন সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন বলেন, সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজে হাসপাতাল চালু না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিক্ষোভ করছেন। এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় ২০২০-২০২১ সালের শিক্ষার্থীরা যারা এমবিবিএস ডাক্তার হওয়ার পর্যায়ে চলে গেছে, কিন্তু ক্লাস করতে না পেরে তারা বিক্ষোভ করছেন। ৫০০ শয্যা মেডিকেল কলেজের হাসপাতাল চালু না হওয়ায় শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও বাজেট অধিবেশনে এসব কথা বলেন সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন। তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তার সুস্পষ্ট বক্তব্য জানতে চান। এ সময় জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে বিধি অনুয়ায়ী স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে নোটিশ দেওয়ার কথা বলেন।

কবে হবে ভবন হস্তান্তর

সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী ১ জুলাই কলেজ কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। বৈঠকে ভবন হস্তান্তর নিয়ে সংকট ও শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে আলোচনা হবে।

সংকটের বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তাক আহমেদ ভূঁইয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, যেখানে আমরা আটকা আছি, সেটি হচ্ছে জনবল সৃজনের অনুমোদন আসেনি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাস্তবায়ন অধিশাখায় ফাইলটি আটকা আছে। জনবল সৃজন হলে হাসপাতাল চালু করতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। গাইনি ও ডার্মাটোলজি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্য বিভাগেরও শিক্ষক নিয়োগের প্রচেষ্টা চলছে।

শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ডিজির (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর) সঙ্গে নিয়মিত কথা বলছি। মন্ত্রণালয়ে বুধবার (১ জুলাই) একটি মিটিং হবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। মন্ত্রণালয়ে অনুরোধ জানিয়েছি হাসপাতাল চালু নিয়ে একটি রোডম্যাপ জানাতে।

সার্বিক বিষয়ে নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, মন্ত্রীর সঙ্গে গত দুই দিন কথা বলেছি। হাসপাতাল চালুর বিষয়ে তিনি খুবই আন্তরিক। আমি বলেছি আপনার আশ্বাস ছাড়া ছাত্ররা ক্লাসে ফিরবে না। তিনি বলেছেন, আগামী ১ জুলাইয়ের সভায় ভালো কিছু হবে। ওই দিন মন্ত্রীর সঙ্গে কলেজের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের নিয়ে পৃথকভাবে বসার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, হাসপাতালের জন্য চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ১৯৩৫ জনের চাহিদা দিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। তালিকা কাটছাট করে ৩৭৫ জন করার পর মন্ত্রণালয় ৭৪ জনের অনুমোদন দিয়েছে। সেটি সংশোধনের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাঠিয়েছি।

নির্মাণকাজ শেষ হলেও জনবল না পেলে হাসপাতাল ভবন বুঝে নেওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে প্রকল্প পরিচালক বলেন, এতবড় ভবন দেখবে কে? হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনার টেন্ডার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। ইউরোপ থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হবে। জনবল পেলে হাসপাতাল ভবন চালু করা সম্ভব হবে।