Advertisement

বহুতল ভবনে আটকে যাচ্ছে কুমিল্লা বিমানবন্দরের ভবিষ্যৎ

সোহাইবুল ইসলাম সোহাগ, কুমিল্লা
বহুতল ভবনে আটকে যাচ্ছে কুমিল্লা বিমানবন্দরের ভবিষ্যৎ
কুমিল্লা বিমানবন্দরের আশপাশে হয়েছে অনেক বহুতল ভবন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

প্রায় তিন দশক ধরে কুমিল্লা বিমানবন্দরে যাত্রীবাহী ফ্লাইট ওঠা-নামা বন্ধ। অথচ এখনও প্রতিদিন আন্তর্জাতিক রুটের ৩৫ থেকে ৪০টি ফ্লাইট এই বিমানবন্দরের নেভিগেশন সিগন্যাল ব্যবহার করছে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে সরকারের আয় হচ্ছে প্রায় চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা। সামান্য সংস্কার, আধুনিকায়ন ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা গেলে বিমানবন্দরটি পুনরায় চালুর সম্ভাবনা থাকলেও সেই সম্ভাবনার সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবস্ট্যাকল লিমিট সারফেস (ওএলএস) জোনে গড়ে ওঠা বহুতল ভবন।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) কুমিল্লা সিটি করপোরেশনকে (কুসিক) সতর্ক করে চিঠি দিয়েছে। সংস্থাটির আশঙ্কা, ওএলএস জোনে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বিমানবন্দর চালু হলে ফ্লাইট উড্ডয়ন ও অবতরণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। এতে দীর্ঘদিনের বন্ধ বিমানবন্দর পুনরায় চালুর সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে।

কুমিল্লা নগরের ঢুলিপাড়া, নেউরা ও রাজাপাড়া এলাকায় ৭৭ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত বিমানবন্দরটি এখন অনেকটাই নিস্তব্ধ। মূল ফটকের পাশে একটি ডেইরি ফার্ম, চারপাশে কৃষিজমি, আগাছায় ঢেকে যাওয়া রানওয়ে এবং সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতি দেখে বোঝার উপায় নেই যে, একসময় এখান থেকেই নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট চলাচল করত।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪০ সালে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক প্রয়োজনে কুমিল্লা বিমানবন্দর নির্মাণ করে। যুদ্ধ শেষে পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতার পরও ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চলাচল অব্যাহত ছিল। পরে ১৯৯৪ সালে পুনরায় ফ্লাইট চালু হলেও যাত্রীসংকটের কারণে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর কখনও যাত্রীবাহী ফ্লাইট চলাচল করেনি।

কুমিল্লা বিমানবন্দরের আশপাশে হয়েছে অনেক বহুতল ভবন। ছবি: এশিয়া পোস্ট
কুমিল্লা বিমানবন্দরের আশপাশে হয়েছে অনেক বহুতল ভবন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তবে ফ্লাইট বন্ধ থাকলেও বিমানবন্দরটি কার্যকর রয়েছে। এখানকার নেভিগেশন সিগন্যাল ব্যবহার করে প্রতিদিন ভারতের আগরতলা, সিঙ্গাপুর ও ব্যাংককগামী আন্তর্জাতিক রুটের ৩৫ থেকে ৪০টি ফ্লাইট চলাচল করে। বিমানবন্দরে এখনও কন্ট্রোল টাওয়ার, নেভিগেশন ফ্যাসিলিটিসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো রয়েছে। বর্তমানে সেখানে ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, রানওয়ে সংস্কার, কিছু যন্ত্রপাতি আধুনিকীকরণ এবং আরও ২০ থেকে ২২ জন জনবল নিয়োগ করা হলে অভ্যন্তরীণ রুটের পাশাপাশি কলকাতা ও আগরতলার মতো আন্তর্জাতিক রুটেও বিমান চলাচল চালু করা সম্ভব।

সম্প্রতি কুমিল্লা বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক মো. তোফায়েল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে কুসিককে জানানো হয়, টমছমব্রিজ-মেডিকেল কলেজ সড়কের হালুয়াপাড়া মসজিদের সঙ্গে মোহাম্মদিয়া হাইটস, ইপিজেড গেটের পূর্ব পাশে খোরশেদ জুয়েল টাওয়ারসহ আশপাশের ভবনমালিকেরা জিপিএস কো-অর্ডিনেশনের ভুল তথ্য দিয়ে ছাড়পত্র গ্রহণ করেছেন, যার সঙ্গে বাস্তব জায়গার মোটেও মিল নেই। ইবনে তাইমিয়া স্কুলের পূর্ব পাশ থেকে ইপিজেডের শেষ সীমানা পর্যন্ত দক্ষিণ চর্থা, উত্তর চর্থা, মনোহরপুর, দক্ষিণ আশ্রাফপুর, ঢুলিপাড়া, রাজাপাড়া, দিশাবন্দ, লক্ষীনগর, নেউরা, কাজীপাড়া মৌজাগুলো ওএলএস ফানেলের ভেতরে, যা রেড জোন। এসব এলাকার ভবন ভবিষ্যতে ফ্লাইট উড্ডয়ন ও অবতরণের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, অনেক ভবনের মালিক ভুল জিপিএস কো-অর্ডিনেট দিয়ে উচ্চতার ছাড়পত্র নিয়েছেন, যা বাস্তব অবস্থানের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। এ কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভবন নির্মাণের অনুমোদনের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কুসিককে অনুরোধ জানিয়েছে তারা।

গত তিন দশকে কুমিল্লার অর্থনীতি ও শিল্পায়নে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। কুমিল্লা ইপিজেড, বিসিক শিল্পনগরী, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং প্রবাসী আয়ের কারণে জেলার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে। দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও প্রবাসীদের যাতায়াতও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সড়কপথে যানজটের কারণে সময় নষ্ট হচ্ছে। বিমান চলাচল শুরু হলে ঢাকা থেকে মাত্র ২৫ মিনিটে কুমিল্লায় পৌঁছানো সম্ভব হবে। এর সুফল পাবে চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার মানুষও।

কুমিল্লা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ডা. আজম খান নোমান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কুমিল্লায় বিমান চলাচল পুনরায় চালু করা সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সভাপতি ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দর সচলের দাবি জানানো হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এখন আবার ওএলএস জোনে বহুতল ভবন নির্মাণ ভবিষ্যতের জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবন নির্মাণে অবশ্যই বিমান চলাচলের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। কুমিল্লা বিমানবন্দর চালু হওয়া বৃহত্তর কুমিল্লাবাসীর প্রাণের দাবি।

বিসিক কুমিল্লার উপ-মহাব্যবস্থাপক মুনতাসীর মামুন এশিয়া পোস্টকে বলেন, কুমিল্লায় বিমানবন্দর চালু হলে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিসিক শিল্পনগরী তেমন বড় সুবিধা পাবে না। তবে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে বিমানবন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে বিদেশি কোনো উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী বা ব্যবসায়িক প্রতিনিধি কুমিল্লায় এলে তাদের যাতায়াত সহজ হবে। এতে শিল্প খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কুমিল্লা বিমানবন্দরের সিএনএস প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ফ্লাইট না থাকলেও বিমানবন্দরটি সরকারের জন্য লাভজনক। তবে যাত্রীবাহী ফ্লাইট চলাচল শুরু হলে কুমিল্লার অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। ওএলএস জোনে অনিয়ন্ত্রিত বহুতল ভবন নির্মাণ বন্ধে আমরা কুসিককে চিঠি দিয়েছি। কারণ ভবিষ্যতে বিমানবন্দর চালুর অনুমোদন মিললেও এসব ভবনের কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলে ফ্লাইট অবতরণ সম্ভব নাও হতে পারে।

বিষয় :কুমিল্লা