logo

শ্রমিক ও জ্বালানি সংকটে হাওরের বোরো চাষিরা

শ্রমিক ও জ্বালানি সংকটে হাওরের বোরো চাষিরা

সুনামগঞ্জের হাওরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। বৈশাখের শুরু থেকেই ধান কাটা চলছে জেলার প্রায় সব হাওরে। কৃষক ও শ্রমিকদের পাশাপাশি কৃষিযন্ত্র কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও রিপার দিয়ে চলছে ধান কাটা। কিন্তু জেলার বিভিন্ন বড় হাওরে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

রোববার (১৯ এপ্রিল) দুপুর পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে।

কৃষকরা জানিয়েছেন, বৃষ্টির পানি জমে কিছু কিছু হাওরে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে কয়েক বছর ধরে হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটার ফলে বাহিরের জেলা থেকে শ্রমিক আসা বন্ধ হওয়ায় চলতি মৌসুমে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে ডিজেলের অভাবে কম্বাইন্ড হারভেস্টার নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না। এতে হাওরপাড়ের কৃষকরা উভয় সংকটে পড়েছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জের ছোট বড় ১৩৭টি হাওরের ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধান চাষাবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মে.টন। যার বাজারমূল্য ৫ হাজার কোটি টাকা। জেলায় ১০ লাখ বোরো চাষির পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক হাজার কৃষি শ্রমিক এসেছেন। জেলায় ধান কাটার যন্ত্র ৬০২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ১৪৬টি রিপার রয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে আরও ২৫টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার এনেছেন কৃষকরা।

সদর উপজেলার খরচার হাওরপাড়ের জগাইরগাঁও গ্রামের কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, হাওরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। জমিতে পানি থাকায় হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা যাচ্ছে না। যারা কাটতে চাচ্ছেন তারাও ডিজেলের কারণে সময়মতো হারভেস্টার পাচ্ছেন না। অন্যদিকে শ্রমিকও পাওয়া যায় না। শ্রমিকের মজুরিও বেশি, ৭ থেকে ৮০০ টাকা দিতে হচ্ছে।

দিরাই উপজেলার কালীয়াকোটা হাওরপাড়ের রফিনগর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ সুর জালাল বলেন, ধান কাটা শুরু হলেও শ্রমিকের সংকট রয়েছে। পানির কারণে সব জমিতে হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। শ্রমিকের মজুরি ৭০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা করে দিতে হচ্ছে। শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি ডিজেল সংকটও রয়েছে, কারণ হাওরের ধান কাটা ও পরিবহনে ডিজেল চালিক হারভেস্টারের পাশাপাশি শতশত ট্রলি রয়েছে। 

শাল্লা উপজেলার ভেরাডহর হাওরপাড়ের কান্দিগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুর ছাত্তার বলেন, কৃষকরা কয়েক বছর পর চরম দুর্ভোগ পড়েছেন। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় হাওরের অনেক ধান নষ্ট হয়েছে। ধান কাটার শ্রমিক ও হারভেস্টার মেশিনের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ১ হাজার টাকা শ্রমিক মজুরি হয়ে গেছে।

জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরপাড়ের হটামারা গ্রামের কৃষক আব্দুল হাকিম বলেন, তিন হাল (১২ একর) জমিতে ধান চাষ করেছি। কয়েক দিনের মধ্যেই ধান কাটা শুরু হবে। ১০ কিয়ার (৩০ শতাংশ) জমি হারভেস্টার দিয়ে কাটা যাবে। অন্য সব জমিতে পানি থাকায় শ্রমিক দিয়ে কাটতে হবে কিন্তু এলাকায় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক বছর হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটায় দূরের জেলা থেকে শ্রমিক আসা বন্ধ করে দিয়েছে। এই বছর হঠাৎ করে শ্রমিকের প্রয়োজন পড়ছে কিন্তু এলাকায় পর্যাপ্ত শ্রমিক নেই।’

জেলা কম্বাইন্ড হারভেস্টার মালিক সমিতির সভাপতি সদর উপজেলার জগাইরগাঁও গ্রামের আবুল বরকত বলেন, ডিজেল সংকটের কারণে নিয়মিত ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। আমার তিনটি মেশিনে প্রতিদিন অন্তত ৬০০ লিটার ডিজেলের দরকার কিন্তু ২০০ লিটারই পাওয়া যায় না। পাম্পে গিয়ে সময়মতো ডিজেল না পাওয়ায় বেশি টাকা দিয়ে খোলা বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে। বিষয়টি কৃষি বিভাগকে জানিয়েও সংকট নিরসন হচ্ছে না। কৃষি ও ইউএনও অফিসের প্রত্যয়ন নিয়ে পাম্পে ডিজেল আনতে গেলে বলা হয় নেই। কৃষি যন্ত্রপাতির জন্য নিয়মিত ডিজেল সরবরাহ না হলে সময়মতো হাওরের ধান কাটা শেষ হবে না। 

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বৃষ্টিতে কিছু কিছু এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল তবে কৃষকরা বাঁধ কেটে ও পাম্প দিয়ে পানি নিষ্কাশন করেছেন।

ইতোমধ্যে সব হাওরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। কোথাও শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানা নেই। জেলার সব উপজেলা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন, কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন। কমাইন্ড হারভেস্টারের জন্য ডিজেলের বিশেষ বরাদ্দ প্রদানের জন্য জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে।