logo
Advertisement

আশ্বাস মিলেছে বারবার, তবুও চালু হয়নি শতকোটির হাসপাতাল

শুয়াইব হাসান, সিলেট
আশ্বাস মিলেছে বারবার, তবুও চালু হয়নি শতকোটির হাসপাতাল
সিলেটের ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতাল। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ভবন আছে, শয্যা আছে, অপারেশন থিয়েটার আছে, আইসিইউ-সিসিইউও প্রস্তুত। নেই শুধু রোগী ও চিকিৎসাসেবা। শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সিলেটের ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালটি নির্মাণ শেষ হওয়ার তিন বছর পরও পুরোপুরি চালু করা যায়নি। অপরিকল্পিত নির্মাণ ও সমন্বয়হীনতার জটিলতায় আটকে আছে হাসপাতালটির কার্যক্রম। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলেও কবে নাগাদ হাসপাতালটি চালু হবে, সেটি নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না।

Advertisement

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সিলেট নগরের চৌহাট্টায় ৬ দশমিক ৯৮ একর জায়গায় হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পদ্মা অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড ২০২০ সালের জানুয়ারিতে মূল নির্মাণকাজ শুরু করে। ২০২৩ সালের জুনে ভবন নির্মাণ শেষ হয়। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও হাসপাতালটি বুঝিয়ে দেওয়ার মতো নির্ধারিত কোনো কর্তৃপক্ষ পাওয়া যায়নি।

শুরু থেকেই ছিল আপত্তি

হাসপাতাল নির্মাণের জন্য চৌহাট্টার ঐতিহাসিক আবু সিনা ছাত্রাবাসের ভবন ভাঙার উদ্যোগ নেওয়া হলে শুরুতেই আপত্তি ওঠে। নাগরিক সমাজ, বিভিন্ন সংগঠন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের দাবি জানান।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো ওই ভবনে একসময় প্রেস ও সংবাদপত্র ছাপা হতো। ব্রিটিশ শাসনামলে সেখানে হাসপাতালও পরিচালিত হয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসাও দেওয়া হয়েছিল সেখানে। পরে সিলেটের প্রথম মেডিকেল কলেজ এবং পরবর্তী সময়ে আবু সিনা ছাত্রাবাস হিসেবে ভবনটি ব্যবহৃত হয়। ভবনটিতে ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁসহ অনেক গুণী ব্যক্তির আগমন ঘটেছিল। সেখানে সিলেটের প্রথম নাটকও মঞ্চস্থ হয়েছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসবিদদের দাবি।

তখন ঐতিহাসিক স্থাপনাটি না ভেঙে সংস্কার করে সংরক্ষণ এবং সেখানে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। তবে শেষ পর্যন্ত ভবনটি ভেঙে হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়।

কর্তৃপক্ষ ছাড়াই নির্মাণ

সিলেট জেলা সদর হাসপাতাল নির্মাণের দায়িত্ব গণপূর্ত অধিদপ্তরকে দেওয়া হলেও শুরুতে হাসপাতাল পরিচালনার জন্য কোনো কমিটি বা কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করা হয়নি। নির্মাণ শেষে ভবনটি কার কাছে হস্তান্তর করা হবে, সেটিও স্পষ্ট ছিল না। এ কারণে নির্মাণ শেষ হওয়ার পর হাসপাতালের দায়িত্ব নেওয়া নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পরে গণপূর্ত অধিদপ্তর বিষয়টি জানিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একাধিক চিঠি দেয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক বিভাগীয় পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান বলেন, হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব যখন মন্ত্রণালয়ে যায়, তখন গণপূর্ত বিভাগ আমাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেনি। আমাদের আগের পরিচালক (ডা. হিমাংশু লাল) এ বিষয়ে চিঠি দিয়ে গেছেন মন্ত্রণালয়ে। তাতে তিনি লিখে যান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অগোচরেই সিলেটে অনেক স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। তারা যেন না বুঝে এসব স্থাপনার দায়িত্ব কোনোভাবেই না নেন।

সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত বলেন, হাসপাতালের স্থাপত্য নকশা, কর্মপরিকল্পনা এবং সেবা দেওয়ার জন্য কক্ষগুলোর বিন্যাসসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সিভিল সার্জন, বিভাগীয় পরিচালক বা ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কাছে দেওয়া হয়নি। নির্মাণের ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে কোনো সমন্বয়ও করা হয়নি। এ কারণে শুরুতে কেউ দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিলেন না।

অনুমোদন মিললেও জটিলতা কাটেনি

চলতি বছরের জুনে হাসপাতাল পরিচালনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়া যায়। এরপর সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে দায়িত্ব পেলেও হাসপাতালটি দ্রুত চালু করা নিয়ে এখনো রয়েছে নানা জটিলতা।

চলতি বছরের ১৫ জুন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে হাসপাতালটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার তথ্য জানান। এরপরই সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে, গত ২০ এপ্রিল খন্দকার মুক্তাদীর হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত চালুর আশ্বাস দেন।

এছাড়া গত ৩১ মে সিলেটের এক অনুষ্ঠানে হাসপাতালটি শিগগিরই পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর ঘোষণা দেন মন্ত্রী। পাশাপাশি সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আরও ১২০০ শয্যার একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান। এর আগে, গত ২ মে সিলেট সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাসপাতালটি চালুর আশ্বাস দিয়েছিলেন।

জানা গেছে, হাসপাতাল পরিচালনার জন্য এখনও প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো চূড়ান্ত হয়নি। কেনা হয়নি চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আসবাব। হাসপাতালের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চূড়ান্ত হয়নি।

গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু জাফর এশিয়া পোস্টকে বলেন, ভবন হস্তান্তরের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রয়েছে। তবে সীমানাপ্রাচীর, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও ফার্নিচার কেনার কাজ বাকি রয়েছে। ফার্নিচারের নমুনা তৈরি করা হয়েছে। এসব কাজ শেষ করতে খুব বেশি সময় লাগবে না। তবে প্রক্রিয়াগত কারণে কত সময় লাগবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

ভবনে যেসব সুবিধা রয়েছে

হাসপাতালটির ১৫ তলা ভবনের মধ্যে আটতলা নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনে রং, বৈদ্যুতিক সংযোগ, টাইলস, কাচ, দরজা-জানালা ও লিফটের কাজ শেষ হয়েছে।

ভবনের বেজমেন্টে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রথম তলায় টিকিট কাউন্টার ও অপেক্ষাকক্ষ, দ্বিতীয় তলায় বহির্বিভাগ, রিপোর্ট বিতরণ ও পরামর্শক কক্ষ এবং তৃতীয় তলায় রোগনির্ণয় বিভাগ রাখা হয়েছে। চতুর্থ তলায় কার্ডিয়াক ও জেনারেল অপারেশন থিয়েটার, আইসিসিইউ ও সিসিইউ রয়েছে। পঞ্চম তলায় স্ত্রীরোগ, চক্ষু, অর্থোপেডিকস ও নাক-কান-গলা বিভাগ এবং ষষ্ঠ থেকে অষ্টম তলায় ওয়ার্ড ও কেবিন রয়েছে। হাসপাতালটিতে ১৯টি আইসিইউ শয্যা, ৯টি সিসিইউ শয্যা ও ৪০টি কেবিন রয়েছে।

আপাতত বহির্বিভাগ চালুর পরিকল্পনা

সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. জিয়াউর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর সিন্ডিকেটের সভায় পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি হাসপাতাল চালুর প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে এবং ইতিমধ্যে একাধিক সভা করেছে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জনবল ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাসহ প্রয়োজনীয় বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, আপাতত বহির্বিভাগ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। দ্রুত হাসপাতাল চালু করতে জনবল চাওয়া হচ্ছে। প্রথমে বহির্বিভাগ, এরপর ধাপে ধাপে ডায়াগনসিস ও ইনডোর বিভাগ চালু করে হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করার চেষ্টা চলছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ না করে নির্মাণ করা ভবনটি শেষ পর্যন্ত সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে চালুর অনুমোদন পেয়েছে। জনবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিনে দ্রুত হাসপাতালটি চালু করা গেলে সিলেটের স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

ওসমানী হাসপাতালে চাপ কমার আশা

সিলেট নগরের কাজলশাহ এলাকায় অবস্থিত এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বিভাগের অন্যতম প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটি ১৯৭৮ সালে বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৮৬ সালে হাসপাতালটির নামকরণ করা হয় জেনারেল এমএজি ওসমানীর নামে। ১৯৯৮ সালে হাসপাতালটি ৫০০ থেকে ৯০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে শয্যাসংখ্যার তুলনায় রোগীর চাপ অনেক বেশি। প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে হয় বলে হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

চৌহাট্টায় নির্মিত ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালটি চালু হলে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে ভবন নির্মাণের তিন বছর পরও জনবল, সরঞ্জাম, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জটিলতা কাটিয়ে হাসপাতালটি কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।