logo

রাঙামাটির ঐতিহ্যবাহী পিলারবিহীন মসজিদ

রাঙামাটির ঐতিহ্যবাহী পিলারবিহীন মসজিদ

ছয় দশকের বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছে রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের পিলারবিহীন বিস্ময়কর মসজিদ। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের দাউদ গ্রুপ কর্ণফুলী পেপার মিলের দায়িত্ব নেওয়ার পর মসজিদটি স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। ১৯৬৭ সালের ৮ ডিসেম্বর (৫ রমজান ১৩৮৭ হিজরি) কেপিএমের আবাসিক এলাকায় দাউদ গ্রুব অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আহমেদ দাউদ এইচ’কে মায়ের নামে মসজিদটির ভিত্তি স্থাপন করেন।

মসজিদটির নির্মাণশৈলীতে মুসলিম ঐতিহ্যের বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে। তবে যে কারণে মসজিদটির সবার কাছে আকর্ষণীয়, সেটি হচ্ছে এই মসজিদটি নির্মাণে কোনো স্তম্ভ তৈরি করা হয়নি। মসজিদের চার দেয়াল ছাড়া কোনো স্তম্ভ নেই। মসজিদের তিন পাশে রয়েছে ২৩টি জানালা, রয়েছে ৯টি দরজা। এই মসজিদে রয়েছে বারান্দাসহ ১৭টি কাতার। প্রতিটি কাতারে দাঁড়াতে পারেন দুই শতাধিক মুসল্লি।

মসজিদে উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব দিক দিয়ে প্রবেশ করার সুযোগ রয়েছে। সচরাচর দালান নির্মাণে সমান ছাদ ব্যবহার করা হলেও এটি নির্মাণে বিম থেকে আড়াআড়িভাবে ঢেউটিন আকৃতিতে ছাদ তৈরি করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, এই কারণে ছাদের চাপ কমে যাওয়ায় স্তম্ভের প্রয়োজন পড়েনি।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মসজিদ পরিচালনার দায়িত্ব পায় কেপিএম কর্তৃপক্ষ। পরে তারা একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করে দেয়। বর্তমানে স্থানীয়দের দানে চলছে ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদ। ফাটল দেখা দিয়েছে মসজিদের দেয়ালে। বৃষ্টির পানি ঢুকে কোথাও কোথাও ঝরে পড়ছে সিলিং। জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে মসজিদটি।

নামাজ পড়তে আসা মুসল্লি মো. মাহাবুব মিয়া বলেন, অনেক বড় বড় মসজিদে মাঝখানের স্তম্ভের জন্য মুসল্লিদের কেউ কেউ ইমাম সাহেবকে সরাসরি দেখতে পারেন না। তবে এই মসজিদের অন্যতম আকর্ষণ হলো, মুসল্লিরা যে যেখানেই নামাজের জন্য দাঁড়ান না কেন তাদের প্রত্যেকেই খতিব কিংবা ইমামকে দেখতে পারেন। নির্মাণের দূরদর্শিতার কারণে যতই গরম পড়ুক না কেন মসজিদে ঢুকলেই পুরো শরীর শীতল হয়ে যায়।

মসজিদ নির্মাণের প্রতক্ষদর্শী বশির খাঁন জানান, এই মসজিদ এখানে নির্মাণের আগে এটি বড় পাহাড় ছিল। মসজিদ নির্মাণে যেসব নির্মাণ সমাগ্রী ব্যবহার করা হয়, সব কিছুই করাচি থেকে আনা হয়। তখন দাউদ আমাকে এখানে চাকরি দেয়। মসজিদ দেখাশোনার দায়িত্বও দেয়। পুরো এক বছর লেগেছে এটির নির্মাণ শেষ করতে। এটি নির্মাণে ভারতের ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করেছে।

কেপিএম জামে মসজিদ মোয়াজ্জেম মো. মহিউদ্দীন বলেন, যখন দাউদ গ্রুপ কেপিএম কাগজ কল পরিচালনা করত, তখন এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। তখন থেকে ইমাম, মোয়াজ্জেম ও খাদেমদের বেতন-ভাতা তারাই বহন করতেন। নানা সংকটের কারণে এখন মাস শেষে ১৫-২০ দিনের বেতন পাই আমরা।

bigStoryContent

মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. ওমর ফারুক বলেন, শবেবরাত, শবেকদর রাতে এবং ঈদের নামাজে অনেক দূর থেকে মানুষ আসে। এটি পিলারবিহীন একটি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান তিনি।

কেপিএম পেপার মিলস উপ-প্রধান প্রকৌশলী ইমাম ফকরুদ্দিন রাজি বলেন, আপাতদৃষ্টিতে এটি অসম্ভব মনে হলেও এটাই সত্য। মসজিদটি লোড বেয়ারিং ওয়াল ও ইনভার্টেড বিম দিয়ে নির্মাণ করায় এখনও দাঁড়িয়ে আছে। এ পদ্ধতিতে খুব উন্নতমানের নির্মাণকৌশল ব্যবহার করে ভেতরের অংশে বিম পিলার ছাড়াও ভবন নির্মাণ করা যায়। এই মসজিদটি তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মসজিদটির সংস্কার করা হলে এটি আরও অনেক বছর টিকে থাকবে।

তিনি আরও বলেন, এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি রক্ষায় এর মৌলিকতা ধরে রেখে সংস্কার ও মসজিদকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে টিকিয়ে রাখার দাবি জানান তিনি।