ঝালকাঠিতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং, ভোগান্তিতে সোয়া দুই লাখ গ্রাহক

এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই, পরের ঘণ্টায় আছে—এভাবেই চলছে ঝালকাঠির বিদ্যুৎ সরবরাহ। শ্রাবণের শেষভাগের ভ্যাপসা গরমের মধ্যে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন জেলার চার উপজেলার মানুষ। দিন-রাত পালাক্রমে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। রাতের লোডশেডিংয়ে পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে শিক্ষার্থীদের। আর বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ওয়ার্কশপ, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও শিল্পকারখানাগুলো পড়েছে বাড়তি সংকটে।
শুধু ঘরের ফ্যান, বাতি কিংবা ফ্রিজ চালানো নয়, বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব এখন পড়ছে উৎপাদন ব্যবস্থাতেও। শিল্পকারখানার মেশিন বন্ধ থাকছে, শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে, সময়মতো পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিকল্প বিদ্যুতের জন্য জেনারেটর চালাতে গিয়ে বাড়ছে জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয়। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে তা সমন্বয় করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
ঝালকাঠি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস) ও ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) আওতায় জেলায় গ্রাহকসংখ্যা প্রায় সোয়া দুই লাখ। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় রোটেশন পদ্ধতিতে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক চাহিদা ১৪ থেকে ২০ মেগাওয়াট। পিক আওয়ারে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ থেকে ২৬ মেগাওয়াটে। অন্যদিকে জেলা শহর ও ওজোপাডিকোর আওতাধীন এলাকায় দৈনিক চাহিদা প্রায় ১০ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বরিশাল থেকে ৩৩ কেভি সঞ্চালন লাইনে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি পূরণে বাধ্য হয়ে রোটেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কখনো একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, আবার কখনো বিদ্যুৎ আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার চলে যায়। দিনে যেমন পরিস্থিতি খারাপ, রাতেও তার ব্যতিক্রম নেই। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে পরিবারের সদস্যদের পড়তে হচ্ছে বাড়তি বিপাকে। অনেকে বাধ্য হয়ে ঘরের বাইরে, দোকানের সামনে কিংবা রাস্তায় কিছুটা বাতাসের আশায় বসে থাকছেন।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সময়সূচিও এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ আরও বেশি। রাতে ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পড়ার টেবিলে বসে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। গরমের কারণে মনোযোগ ধরে রাখাও সম্ভব হয় না। শিক্ষার্থী মো. আরিফুর রহমান বলেন, ‘পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ ছাড়া দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করা সম্ভব হচ্ছে না।’
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও চিকিৎসাসেবার প্রতিষ্ঠানগুলোতেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আধুনিক বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার অপরিহার্য হওয়ায় বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক সময় কাজ বন্ধ রাখতে হয়। বিকল্প বিদ্যুৎ চালু রাখতে বাড়তি জ্বালানি খরচ করতে হচ্ছে।
মমতাজ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বত্বাধিকারী মো. শাহ আলম বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিঘ্ন ঘটছে। বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু রাখতে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ঘনঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও। ফ্রিজ, কম্পিউটার, ফটোকপিয়ার, প্রিন্টারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র বারবার বন্ধ ও চালু হওয়ায় যন্ত্রপাতির ওপর চাপ বাড়ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
ব্যবসায়ী মো. বাদল মুন্সি বলেন, ঘনঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ফ্রিজ, কম্পিউটারসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্র ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। এতে কাজের ক্ষতির পাশাপাশি বাড়ছে অতিরিক্ত খরচ।
বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিল্প ও উৎপাদন খাতে। কারখানার মেশিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছাড়া চালানো সম্ভব নয়। মাঝপথে বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এতে কাঁচামাল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, উৎপাদনের সময় বেড়ে যায় এবং শ্রমিকদের কর্মঘণ্টাও অপচয় হয়।
কারখানা মালিক মো. বশির রাড়ী বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে মেশিন চালানো যায় না। ফলে শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হয় এবং সময়মতো কাজ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।
উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, শিল্পকারখানার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ শুধু উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি পণ্যের গুণগত মান, সময়মতো সরবরাহ এবং বাজার ধরে রাখার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ছোট উদ্যোক্তাদের পক্ষে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ঝালকাঠিতে শিল্পায়নের সম্ভাবনা দীর্ঘদিনের। বরিশাল-ঝালকাঠি-খুলনা মহাসড়কের পাশে ঢাপড় এলাকায় গড়ে উঠেছে ঝালকাঠি বিসিক শিল্পনগরী। প্রায় ১১ দশমিক ৮ একর জমির ওপর নির্মিত এই শিল্পনগরীতে ৭৯টি প্লট রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক প্লট অব্যবহৃত পড়ে ছিল এবং উদ্যোক্তাদের অনেকে প্লট বরাদ্দ নিয়েও কারখানা স্থাপন করতে পারেননি। অর্থাৎ শিল্পকারখানা গড়ে ওঠার আগে যেমন অবকাঠামো ও বিনিয়োগসংক্রান্ত বাধা ছিল, এখন উৎপাদনে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎও হয়ে উঠছে বড় চ্যালেঞ্জ।
ঝালকাঠি সদর এলাকায় নিবন্ধিত এ আর এস সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড একটি লবণ কারখানা রয়েছে, যেখানে প্রায় ৫০ জন শ্রমিক কাজ করেন। নলছিটির বিসিক শিল্পনগরীতে সুন্দরবন পলিমারস লিমিটেড নামে একটি প্লাস্টিক কারখানাও রয়েছে। এ ছাড়া ঝালকাঠিতে পুরোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিড়ি কারখানাও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে দেয়, জেলায় শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত হলে সেই ভিত্তি শক্তিশালী হওয়ার বদলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিই বাড়ে।
ওজোপাডিকোর আওতাধীন এলাকায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা যেখানে প্রায় ১০ দশমিক ৫ মেগাওয়াট, সেখানে বরিশাল থেকে ৩৩ কেভি লাইনে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. মতিউর রহমান বলেন, ওজোপাডিকোর আওতায় জেলায় প্রায় ২৭ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। নয়টি ফিডারের মাধ্যমে তাদের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় রোটেশন পদ্ধতিতে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। সরবরাহ বাড়লে লোডশেডিংও কমে আসবে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম (প্রশাসন) মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকায় দৈনিক চাহিদা ১৪ থেকে ২০ মেগাওয়াট। পিক আওয়ারে তা ২২ থেকে ২৬ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। কিন্তু জাতীয় গ্রিড ও উপকেন্দ্র থেকে চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ পাওয়ায় নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
শুধু সরবরাহ ঘাটতিই নয়, ঝালকাঠির বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে সঞ্চালন লাইনের ঝুঁকি। ঝালকাঠি থেকে বরিশাল পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩৩ কেভি সঞ্চালন লাইনে নিয়মিত ট্রিমিং ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হলেও ঝড়-বৃষ্টির সময় সড়কের পাশের গাছের ডালপালা তারের ওপর পড়ে লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। রোটেশনভিত্তিক লোডশেডিংয়ের সঙ্গে এ ধরনের আকস্মিক বিভ্রাট যুক্ত হওয়ায় গ্রাহকদের ভোগান্তি আরও বাড়ে।
ঝালকাঠির অর্থনীতিতে কৃষি ও ব্যবসার পাশাপাশি শিল্প খাতকে শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে। বিসিক শিল্পনগরী, স্থানীয় লবণশিল্প, প্লাস্টিক, ফার্নিচারসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ সেই সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য শুধু জমি, সড়ক ও বাজার থাকলেই হয় না—প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে গেলে বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ শুধু ওই কারখানার ক্ষতি করে না; এর সঙ্গে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা, কাঁচামালের ব্যবহার, পণ্যের সরবরাহ, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং উদ্যোক্তার বিনিয়োগ—সবকিছুই জড়িত। ফলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সংকট নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে পারে।
ঝালকাঠির বর্তমান চিত্রে তাই প্রশ্ন উঠছে—একদিকে শিল্পায়নের জন্য বিসিক শিল্পনগরী ও উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ রয়েছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের ঘাটতি ও ঘনঘন লোডশেডিং যদি উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত শিল্পায়ন কতটা এগোবে?
ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে শুধু ভোগান্তিতে থাকা সাধারণ মানুষ নয়, ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারাও দ্রুত সমাধান চান। তাদের দাবি, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ঝড়-বৃষ্টিতে গাছের ডালপালা পড়ে যাতে লাইন বিচ্ছিন্ন না হয়, সে জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারাও বলছেন, সরবরাহ বাড়লেই লোডশেডিং কমে আসবে। এখন সেই সরবরাহ বাড়ার অপেক্ষায় জেলার প্রায় সোয়া দুই লাখ গ্রাহক। ভ্যাপসা গরমে যখন মানুষের স্বস্তির জন্য ফ্যানের বাতাস প্রয়োজন, তখন ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়া শুধু দৈনন্দিন দুর্ভোগ নয়—ঝালকাঠির ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সম্ভাবনাময় শিল্পখাতের জন্যও এটি হয়ে উঠছে বড় বাধা। শিল্পকারখানাগুলো যাতে উৎপাদন বন্ধের উপক্রমে না পড়ে, সে জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন জেলার অন্যতম জরুরি দাবি।



