ভারী বর্ষণে থইথই, সাভারে নৌকা বিক্রির রেকর্ড

গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তলিয়ে গেছে সাভার ও আশুলিয়ার নিচু এলাকা। রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, বাজার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবখানেই এখন থইথই পানি। যাতায়াতের সড়কগুলো যেন রূপ নিয়েছে একেকটি নদীতে। চরম দুর্ভোগে পড়া মানুষের যাতায়াতের এখন শেষ ভরসা হয়ে উঠেছে নৌকা।
আর এই জলাবদ্ধতাকে কেন্দ্র করে নৌকা তৈরির জন্য ঐতিহাসিকভাবে খ্যাত আশুলিয়ার শিমুলিয়া বাজারে লেগেছে নৌকা বিক্রির ধুম। গত কয়েক বছরের রেকর্ড ভেঙে মাত্র এক সপ্তাহেই এই হাটে বিক্রি হয়েছে হাজারের অধিক নৌকা।
বংশপরম্পরায় নৌকা তৈরির জন্য দেশজুড়ে খ্যাতি রয়েছে সাভারের শিমুলিয়া অঞ্চলের। বছরের অন্য সময় এখানকার কারিগররা অন্য পেশায় ব্যস্ত থাকলেও বর্ষা কিংবা বন্যা এলেই তারা ফিরে যান তাদের আদি পেশায়। মেহগনি, চাম্বল ও কড়ই কাঠের তৈরি এখানকার ডিঙি বা কোষা নৌকা টেকসই ও মজবুত হওয়ায় পুরো ঢাকা ও এর আশেপাশের জেলাগুলোতে এর বিশেষ সুনাম রয়েছে।
সরেজমিনে শিমুলিয়া নৌকা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে ছোট, মাঝারি ও বড়ো সব ধরনের নৌকার খোঁজে বিভিন্ন উপজেলা থেকে ছুটে আসছেন ক্রেতারা। চাহিদা ও চাপ এতটাই বেশি যে পছন্দসই নৌকা পেতে রীতিমতো সিরিয়াল দিতে হচ্ছে তাদের। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে নৌকা তৈরি। দিনে ১৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করছেন কারিগররা। এতে সারাদিনে নৌকা তৈরি হচ্ছে অর্ধশতাধিক। যা বিক্রি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

ধামরাই থেকে নৌকা কিনতে আসা ক্রেতা আলতাফ হোসেন বলেন, আমাদের এলাকার রাস্তাঘাট সব পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। ছেলে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া আসা, বাজারে যাওয়া সব বন্ধ। বাধ্য হয়ে শিমুলিয়া হাটে একটা ছোট নৌকা কিনতে আসছি। কিন্তু নৌকার দাম অনেক বেশি তাও সিরিয়াল দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
একই হাটে নৌকা খুঁজছিলেন জিরাবোর বাসিন্দা মফিজুল ইসলাম। তিনি ক্ষোভ ও বাধ্যবাধকতার কথা জানিয়ে বলেন, রাস্তায় কোমর পানি। রিকশা-ভ্যান কিচ্ছু চলে না। জরুরি প্রয়োজনে বের হতে পারছি না। নৌকার দাম গত বছরের চেয়ে দ্বিগুণ চাইছে। কিন্তু কী আর করা টিকে থাকতে হলে তো নৌকা লাগবোই। তাই বাধ্য হয়ে বেশি দামেই কিনলাম।
চাহিদা বাড়ার সুযোগে দিন-রাত এক করে কাজ করছেন নৌকা তৈরির কারিগররা। একটি নৌকা তৈরিতে সময় লাগছে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টা। দিন-রাত মিলিয়ে একেকজন কারিগর তৈরি করছেন চার থেকে পাঁচটি নৌকা। নৌকা তৈরির ব্যস্ততার ফাঁকে কারিগর কালাম বলেন, শিমুলিয়া বাপ-দাদার আমল থেকেই নৌকা বানানোর জন্য বিখ্যাত। বন্যার কারণে হঠাৎ নৌকার চাহিদা অনেকে বেড়েছে। আমাদের দম ফেলার সময় পাচ্ছি না। কাঠের দাম আর মজুরি বাড়ার কারণে নৌকার দাম একটু বেশি। তবে লাভ ভালোই হচ্ছে।

হাটের নৌকা ব্যবসায়ী জালিস হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমার জীবনে এই হাটে এত নৌকার চাহিদা দেখিনি। গত কয়েক বছরের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। মাত্র এক সপ্তাহেই এই হাটে হাজারের মতো নৌকা বিক্রি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে শিমুলিয়া বাজারের এই ঐতিহ্যবাহী নৌকা তৈরি শিল্পকে আরও বড়ো পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এতে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে বড়ো ভূমিকা রাখবে।
এ বিষয়ে সাভারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ভারী বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে প্রশাসন কাজ করছে। তবে এই দুর্যোগের সময়ে শিমুলিয়ার ঐতিহ্যবাহী নৌকা তৈরি শিল্প স্থানীয় মানুষের যাতায়াতে বড়ো ভূমিকা রাখছে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগর ও ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে এবং এই ঐতিহ্যকে আরও বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও ঋণ সহায়তার বিষয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব।

.png)






