logo

কাজ শেষের আগেই ধসে পড়ল ফসলরক্ষা বাঁধ

কাজ শেষের আগেই ধসে পড়ল ফসলরক্ষা বাঁধ

হাওরাঞ্চলে এখনো ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়নি, বোরো ফসলরক্ষা বাঁধের পাশে নদী বা হাওরে অতিরিক্ত পানিও নেই, এরপরও ফসলরক্ষা বাঁধে দেখা দিয়েছে ফাটল ও ধস। এতে বোরো ফসল নিয়ে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।

সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার কাউয়াজুরী হাওরে ১৪ নম্বর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসির) বাঁধে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রকল্পের ২৯০০ মিটার বাঁধের প্রকল্পের বরাদ্দ ২১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। এই পিআইসির সভাপতি আকিবুল মিয়া। টাইলা গ্রামের চামতী নদীর পাশেই চলছে এই বাঁধের কাজ। 

মাটির কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিপাত ছাড়াই বাঁধের একপাশ ধসে গেছে, দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। ধসে যাওয়া বাঁধের মাটি আটকাতে বাঁশের বেড়া দেওয়া হচ্ছে। বৃষ্টি হলে বাঁধ আরও ধসে যেতে পারে বলে শঙ্কায় আছেন স্থানীয়রা।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার কাউয়াজুরী হাওরে বোরো জমির পরিমাণ ১ হাজার ২৩০ হেক্টর। চলতি মওসুমে বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৬১০ টন, যার মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধের সব কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও অনেক বাঁধে চলছে মাটির কাজ। বাঁধের মাটি কম্প্যাকশন করা ও ঘাস লাগানো বাকি রয়েছে। 

কৃষক সংগঠনের অভিযোগ, বাঁধের কাজে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। দায়সারা গোছের মাটি ফেলে কাজ করানো হচ্ছে। অধিকাংশ বাঁধে মাটির কম্প্যাকশন ঠিকমত হয়নি। তাই বৃষ্টিপাতের আগেই বাঁধে ফাটল ও ধস দেখা দিয়েছে।

কাউয়াজুরী হাওরের ১৪ নম্বর পিআইসি সভাপতি আকিবুল মিয়া বলেন, বাঁধের পাশেই চামতী নদী। কয়েক বছর ধরে এই নদী থেকে মাটি তোলা হয়েছে। গত বছরও এই অংশ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকেছে। কাজ শুরুর প্রথমে কোনো সমস্যা হয়নি। বাঁধের সবচেয়ে বেশি মাটি পড়েছে এই ভাঙনে। কিন্তু বাঁধের পাশে জমির পানি নিচ দিয়ে যাওয়ায় বাঁধে ধস নেমেছে। ধস ঠেকাতে বাঁধের একাংশে বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বাঁধের ধসে যাওয়া অংশের জন্য জিও-ব্যাগ চেয়ে কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও তারা কর্ণপাত করেনি। ভাঙনের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী বাঁশের বেড়া দিতে বলেছেন, সে অনুয়ারী কাজ হয়েছে।

হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও বাঁধের কাজে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে। প্রথম বরাদ্দ ছিল ১৪৫ কোটি টাকা, পরে বৃদ্ধি করে ১৪৮ কোটি করা হয়েছে। বাঁধের কাজের ঢিলেমি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রশাসন ও মনিটরিং কমিটি দায় এড়াতে পারে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের যোগসাজশে দুর্নীতি চলছে। আগাম বন্যা এলে এসব বাঁধ দিয়ে ফসলরক্ষা করা সম্ভব হবে না।

শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহজাহান বলেন, কাউয়াজুরী হাওরের বাঁধে ফাটল ও ধসে যাওয়ার বিষয়টি জানার পরই দ্রুত বাঁশের বেড়াসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের মাটি আটকাতে যা দরকার সব রকম ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-২ মো. এমদাদুল হক বললেন, কাউয়াজুরী হাওরের বাঁধে কাজ চলছে। নির্বাচনের কারণে বাঁধের কাজে কিছু বিলম্ব হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কাজের সময়সীমা থাকলেও আরও ১৫ দিন সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাঁধের কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি। সব বাঁধের ক্লোজার ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশের কাজ আগেই শেষ হয়েছে। দ্রুত বাঁধের কাজ শেষ করার জন্য সবাইকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলার ৯৫টি হাওরে চলতি বোরো মওসুমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমি চাষাবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ টন। যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এসব ফসল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতে ১৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবধানে কৃষকদের নিয়ে গঠিত ৭১৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) বাঁধের কাজ করছে। গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর শুরু হওয়া বাঁধের কাজ ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ করার কথা থাকলেও অধিকাংশ বাঁধের মাটির কাজই শেষ হয়নি। কাজ শেষ না হওয়ায় ১৫ দিন সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে।