logo

কেরানীগঞ্জ/ব্যবহার কমেছে, টিকে আছে কোষা নৌকার ঐতিহ্য

ব্যবহার কমেছে, টিকে আছে কোষা নৌকার ঐতিহ্য
ঢাকার কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুর বাজারে সারি সারি সাজিয়ে রাখা হয়েছে নতুন তৈরি করা কোষা নৌকা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ঢাকার কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুর বাজারে এখনও তৈরি হচ্ছে কোষা নৌকা। তবে আগের মতো ক্রেতা নেই। জলাশয় কমে যাওয়ায় কমেছে চাহিদাও। তবু বর্ষা এলেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন কারিগরেরা।

একসময় বর্ষাকালে কেরানীগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে যেত। খাল-বিল ও জলাশয়নির্ভর এই জনপদে মানুষের চলাচলের অন্যতম মাধ্যম ছিল কোষা নৌকা। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট ও বসতি সম্প্রসারণের কারণে কমেছে পানিপথের ব্যবহার। এর প্রভাব পড়েছে কোষা নৌকার বাজারেও।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুর বাজার ঘুরে দেখা যায়, কয়েকটি কাঠের দোকানে চলছে নৌকা তৈরির কাজ। ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের কোষা নৌকা বানাতে ব্যস্ত কারিগরেরা। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, একসময় বর্ষা মৌসুমে এ বাজারে ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকত। এখন সেই ব্যস্ততা অনেকটাই কম।

কোষা নৌকা তৈরির কারখানার মালিক মো. ইমরান প্রায় ২২ বছর ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, আগে তার দোকানে ১৫ থেকে ২০ জন কারিগর কাজ করতেন। এবার চারজন কর্মচারী নিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, মৌসুমের সময়ও আশানুরূপ বিক্রি নেই। অনেক সময় কম লাভে, কখনো লোকসান দিয়েও নৌকা বিক্রি করতে হচ্ছে।

রাজেন্দ্রপুর বাজারের কাঠ ব্যবসায়ী মো. নাসির বলেন, বাজারে প্রায় ১২টি কাঠের দোকান রয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এসব দোকানে কোষা নৌকা তৈরি হয়। কাঠ ব্যবসার পাশাপাশি এটি ব্যবসায়ীদের বাড়তি আয়ের একটি উৎস।

কারিগর রাজিব মিয়া বলেন, সকালে কাজ শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত নৌকা তৈরিতে সময় কাটে। তিনি জানান, ১২ থেকে ১৫ ফুট দৈর্ঘ্যের নৌকা তৈরির মজুরি ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ১৮ থেকে ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের নৌকার জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা পান। তিনি বলেন, এখন আর আগের মতো চাহিদা নেই। বর্ষা শেষে অন্য সময় ঘরবাড়ি তৈরির কাজ করি।

বাজারে বর্তমানে আকারভেদে একটি কোষা নৌকার দাম ৫ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকার মধ্যে। স্থানীয় চাহিদার পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও ক্রেতারা আসেন। কেউ বর্ষায় চলাচলের জন্য, আবার কেউ রিসোর্ট বা রেস্তোরাঁর সাজসজ্জার কাজে ব্যবহার করতে এসব নৌকা কিনে নিয়ে যান।

নৌকা কিনতে আসা সুমন মিয়া বলেন, বর্ষা মৌসুমে তাদের এলাকার অনেক জায়গায় পানি জমে থাকে। তাই চলাচলের সুবিধার জন্য তিনি নৌকা কিনতে এসেছেন। তার ভাষ্য, ঢাকার আশপাশে এখন এ ধরনের বাজার খুব কম দেখা যায়।

উপজেলার বাঘৈর এলাকার বাসিন্দা ইকবাল হোসেন বলেন, আগে বর্ষায় চারদিকে পানি থাকত। এখন বিভিন্ন স্থানে ভরাট হয়ে যাওয়ায় উন্মুক্ত জলাশয় কমে গেছে। ফলে কোষা নৌকার প্রয়োজনও আগের তুলনায় কমে এসেছে।

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, কোষা নৌকা শুধু একটি যানবাহন নয়, কেরানীগঞ্জের জলজ সংস্কৃতিরও অংশ। ব্যবহার কমলেও এটি এখনো একটি ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে টিকে আছে। বর্ষা এলেই রাজেন্দ্রপুর বাজারে সেই ঐতিহ্যের উপস্থিতি আবারও চোখে পড়ে।